বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) শুক্রবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে দ্রুত তীব্রতর হয়ে ওঠা এল নিনো। এতে বিভিন্ন অঞ্চলে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের এই সংস্থাটির সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার মত দুর্যোগের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বভাগের উপরিতলের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতাই এল নিনো নামে পরিচিত। এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো, যখন ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ভয়াবহ দাবানলের সঙ্গে লড়ছে, এবং দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিজনিত ব্যাপক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, 'এল নিনো আর শুধু দোরগোড়ায় নয়, এটি এখনই ঘরে ঢুকে পড়েছে এবং তাপমাত্রাকে আরও চড়িয়ে তুলছে। এটি নিছক শুরুমাত্র। এল নিনো আরও জোরদার হয়ে উঠছে এবং ইতোমধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীকে আরও উষ্ণ করছে।'

পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫.২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করে সার্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের মহাসচিব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান রেখেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এল নিনো ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও সম্প্রসারণই এই সঙ্কটকে আরও গভীর করছে উল্লেখ করে গুতেরেস নতুন কয়লা, তেল ও গ্যাস প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন অবিলম্বে বন্ধের ডাক দেন।

ডব্লিউএমওর পূর্বাভাষে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় সকল স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী তাপমাত্রা বিরাজ করবে। এর মধ্যে আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় তীব্র তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বেশী ঝুঁকি রয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো জোর দিয়ে বলেছেন, এল নিনোর গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলেও কেবল আগাম সতর্কবার্তাই যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সরকার ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোকে ওই সতর্কবার্তার ওপর ভিত্তি করে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তার মতে, পূর্বাভাস নিজে কোন দুর্যোগ প্রতিহত করতে পারে না; মানুষই পারে। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তার ওপরই ভবিষ্যতের প্রভাব নির্ভর করবে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছর এল নিনো রেকর্ড মাত্রার তীব্রতায় পৌঁছতে পারে। যদিও এ বিষয়ে কম্পিউটার-ভিত্তিক পূর্বাভাস মডেলগুলোর হিসাব এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে জানা যায়, এ অবস্থা মোকাবেলায় গুতেরেস চারটি ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন। প্রথমটি হলো, শহর ও জাতীয় পর্যায়ে তাপপ্রবাহ মোকাবেলার পরিকল্পনা এবং আগাম সতর্কব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে জনগণকে সুরক্ষা প্রদান। পাশাপাশি পরিবেশ-বান্ধব শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রকে অধিক নিরাপদ করার জন্য সরকারকে তাপমাত্রা বিষয়ক নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যাতে পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে কর্মরতদের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে। তৃতীয় পরামর্শ হলো, শহর, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের নকশা প্রণয়নয়নের সময় তীব্র তাপপ্রবাহের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সাথে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেটে এই ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সর্বশেষ ও গুরুতরভাবে, 'বিশ্বকে এই সংকট আরও উস্কে দেওয়া বন্ধ করতেই হবে' বলে উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন, প্রতিটি দুর্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা না দেখে বিশ্ব উষ্ণায়নের মূল চালিকাশক্তি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাসে জোর দিতে হবে।