জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি একটিমাত্র শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে। পাঁচটি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন শুধু প্রধান শিক্ষক আবদুল মমিন। বাকি চারটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৭০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রাক-প্রাথমিকে ১৭, প্রথম শ্রেণিতে ১১, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১১, তৃতীয় শ্রেণিতে ১০, চতুর্থ শ্রেণিতে ১০ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ১১ জন শিক্ষার্থী ভর্তি আছে। তবে প্রতিদিন গড়ে উপস্থিত থাকে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন। গত বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের একটি ক্লাসরুমে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে পাঠ নিচ্ছে। প্রধান শিক্ষক আবদুল মমিন তাদের ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে পড়াচ্ছিলেন। বিদ্যালয়ের একতলা পাকা ভবনে দুটি এবং টিনশেড ঘরে আরও দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে।

২০১৮ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন আবদুল মমিন। তিনি জানান, তার যোগদানের সময় তিনজন সহকারী শিক্ষক ছিলেন যারা পর্যায়ক্রমে অবসরে চলে যান। পরে মৌখিকভাবে একজন শিক্ষক দেওয়া হয়েছিল, যিনি চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি অবসরে যান। এরপর থেকে তিনি একাই পুরো বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। প্রধান শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, দাপ্তরিক কাজে প্রায়ই উপজেলা সদরে যেতে হতো; তবে এখন ক্লাস শেষ করে সে কাজ করেন। শিক্ষক না থাকায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে আগ্রহী নন।

এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা ফেসবুকে বিষয়টি তুলে ধরেন। এর প্রেক্ষিতে ৯ জুলাই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় পাশের একটি বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষককে সাময়িকভাবে পাঠদানের জন্য মৌখিক নির্দেশ দেয়। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে স্থায়ীভাবে পদায়ন করা হয়নি বলে জানা গেছে। গ্রামবাসী মিন্টু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, একজন শিক্ষক কীভাবে এতগুলো ক্লাস নেবেন? শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ে যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। কাঁচা রাস্তায় সব সময় যানবাহন পাওয়া যায় না। উপজেলা সদরে যাতায়াতে মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা; বৃষ্টি হলে তা-ও কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই কারণে শিক্ষকরা এখানে আসতে চান না। ছয়-সাত বছর আগে বিদ্যালয়ে প্রায় ১২০ শিক্ষার্থী ছিল, যা বর্তমানে ৭০-এ নেমে এসেছে। শিক্ষক সংকট না কাটলে সংখ্যা আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। সবচেয়ে কাছের অন্য বিদ্যালয়টি সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাদিক ইসলাম, মো. আলামিন ও তামান্না আক্তার প্রথম আলোকে জানান, শিক্ষক না থাকায় তাদের ক্লাস ঠিকমতো হয় না। অনেক সময় তারা নিজেরা ক্লাসে বসে থাকে। আবার দুই শ্রেণি একসঙ্গে ক্লাস করতে হয়। তারা মনে করেন, নতুন শিক্ষক পেলে লেখাপড়া ভালো হতো।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, মাদারগঞ্জে মোট ২০১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকের মোট ১ হাজার ২৩৬টি পদের মধ্যে ১ হাজার ৮৮ জন কর্মরত এবং ১৪৮টি পদ শূন্য। জামালপুরের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় সেখানে শিক্ষকরা যেতে চান না। এ ছাড়া শিক্ষক সংকটও রয়েছে। তবে গত সপ্তাহে ওই বিদ্যালয়ের জন্য একজন শিক্ষককে পাঠদান করতে বলা হয়েছে। দ্রুত আরও শিক্ষক পদায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।