বরেন্দ্র অঞ্চলে এবার বোরো ধান চাষে নেমেছেন চাষিরা। বৃষ্টি শুরু হতেই মাঠে কাজের ধুম পড়ে গেছে। কলের লাঙল দিয়ে জমি চাষ দ্রুত করা গেলেও মই দেওয়ার জন্য এখন গরুর প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু গ্রামের বাড়িগুলোতে আগের মতো গরু আর দেখা যায় না। এই পরিস্থিতিতে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষকেরা নতুন এক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তারা জমিতে মই দেওয়ার জন্য নাটোরের সিংড়া উপজেলা থেকে ঘোড়া ভাড়া করে এনেছেন। শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে গোদাগাড়ীর চৈতন্যপুর গ্রামের মাঠে ঘোড়া দিয়ে মই দেওয়ার এই দৃশ্য দেখা যায়।
সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের বিসাশ গ্রামের বাসিন্দা সেলিম হোসেন জানান, তিনি ঘোড়া দিয়ে মই দেওয়ার কাজ বিভিন্ন এলাকায় করেন। তাঁর সঙ্গে গ্রামের অন্যান্য ঘোড়ার মালিকরাও এসেছেন। চাষের জমিতে পানি দেওয়ার পর মই দিয়ে জমি সমান করাই তাদের কাজ। এখানে প্রতিটি মই টানে দুটি করে ঘোড়া ব্যবহার করা হচ্ছে। গরু দিয়ে মই টানার মতো চাষিকে মইয়ের ওপর উঠতে হয় না। মইয়ের সঙ্গে একটি হাতল সংযুক্ত থাকে। জমিতে কোথাও উঁচু-নিচু থাকলে সেই হাতল ধরে চাপ দিলেই জমি সমান হয়ে যায়। সেলিম হোসেনের ভাষ্য, একজোড়া ঘোড়া দিয়ে দিনে ১০ থেকে ১৫ বিঘা জমিতে মই দেওয়া সম্ভব।
তাঁদের এই কাজের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি এলাকার ট্রাক্টরচালক মাহাবুবুর রহমান সেলিমকে ফোন করেন। গত বছর প্রথমবার গোদাগাড়ীতে আসেন সেলিম। এবারও তিনি এসেছেন। শুক্রবার ২১ বিঘা জমিতে মই দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। চলনবিল এলাকা থেকে ঘোড়া ভাড়া করে এনে বরেন্দ্র অঞ্চলের জমিতে মই দেওয়ার এই প্রথা চলছে। সেলিম হোসেনের দুটি ঘোড়ার মধ্যে একটি ধবধবে সাদা। সেটি দেখতে খুব সুন্দর হওয়ায় তিনি ওই ঘোড়াটি মইয়ের কাজে ব্যবহার করেন না। কারণ কাদায় হাঁটলে ঘোড়ার গায়ের রং নষ্ট হয়ে যায় এবং দৌড়ানোর ক্ষমতাও কমে যায়। একই গ্রামের শফিকের সঙ্গে তিনি জোড়া করেছেন। অন্যদিকে আমিরুল ও আল আমিন মিলে আরেকটি মই তৈরি করেছেন।
দুপুরে চৈতন্যপুর গ্রামের ওবায়দুলের আড়াই বিঘা জমিতে মই দেওয়ার কাজ করছিলেন তারা। এই জমির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাক্টরচালক মাহাবুবুর রহমানই। রাতে থাকার জন্য ঘোড়ার মালিকেরা ইটের ভাটার জন্য তৈরি দুটি পরিত্যক্ত ঘর দুই হাজার টাকা দিয়ে ভাড়া নিয়েছেন। সেখানেই তারা আরও ১২-১৩ দিন থাকার পরিকল্পনা করছেন। সেলিম জানান, অল্প কয়েক দিনের জন্য ভাড়াটা বেশি মনে হলেও চারটি ঘোড়ার খাবার ও নিজেদের থাকার জন্য দুটি ঘর ছাড়া উপায় নেই। প্রথম দিনেই ঘরের মালিক অগ্রিম টাকা চেয়েছিলেন, কিন্তু কাজ না করে টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তারা। মাঠে কাজ শেষে জমির মালিকের কাছ থেকে টাকা পেলেই তা দিতে পারবেন।
ঘোড়ার মালিক আল আমিন জানান, তারা শুধু ধান চাষের জমিতেই মই দেন না। আলু তোলার সময় বগুড়ায় চলে যান। অন্য ফসল তোলার জন্যও বিভিন্ন এলাকায় যান। এর আগে কুষ্টিয়ায়ও কাজ করেছেন। তাদের গ্রামে অন্তত ২০টি ঘোড়া রয়েছে। সবাই ঘোড়া দিয়ে গাড়ি টানা ও চাষের জমিতে মই টানার কাজ করেন। বর্তমানে চলনবিল এলাকায় ঘোড়ার কোনো কাজ না থাকায় তারা এই এলাকায় এসেছেন। আবার ঘোড়দৌড়ের সময় ঘোড়া নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন বলে জানান।



