দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত দীর্ঘদিন ধরে চরম জনবল সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে পর্যাপ্ত সেবাদাতার অভাবে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে আরও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।

মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট বিরাজ করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে, এই খাতে অনুমোদিত ৬৫ হাজার ২৩০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১৮ হাজার ৯৪৭টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা ও টিকাদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত স্বাস্থ্য সহকারীর (এইচএ) ২০ হাজার ৯০৯টি পদের মধ্যে ৬ হাজার ৯৫৩টি পদই খালি। পরিবার কল্যাণ সহকারীর (এফডব্লিউএ) ৮ হাজার ২৯৩টি, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার (এফডব্লিউভি) ৩ হাজার ১৬১টি এবং কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের (সিএইচসিপি) ৫৪০টি পদ শূন্য রয়েছে।

লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন আবদুল হাকিম জানান, তাঁর জেলায় চিকিৎসকদের ৫০ শতাংশ পদই ফাঁকা। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকট এতটাই চরম যে অর্ধেকের কম জনবল দিয়ে কাজ চালাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) ২৩০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র ৭০ জন। বাকি ১৬০টি পদ সেখানে খালি পড়ে আছে।

সম্প্রতি ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এটি পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটের (৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করেছেন, এই বড় নিয়োগের ৮০ শতাংশই পূরণ করা হবে নারী কর্মী থেকে, যা দেশের কর্মসংস্থান ও নারীদের ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করবে।

চলমান নিয়োগের একাধিক কার্যক্রম ভিন্ন ভিন্ন ধাপে এগিয়ে চলেছে। চিকিৎসকদের ঘাটতি মেটাতে ৪৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ৪৫০ জন, ৪৬তম বিসিএসের মাধ্যমে ১ হাজার ৬৮২ জন, ৪৭তম বিসিএসের মাধ্যমে ১ হাজার ৩৩১ জন, ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ৩ হাজার ২৬৩ এবং ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমে আরও ৬৫০ জন সহকারী সার্জন নিয়োগের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চলছে। এর পাশাপাশি সিনিয়র স্টাফ নার্স ও দশম গ্রেডের মিডওয়াইফ পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগের চূড়ান্ত ধাপ সম্পন্ন করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) জালালউদ্দীন মো. রুমী জানান, স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটাতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে মূলত তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এগুলোকে একটি ক্যাটাগরিতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের সুবিধা-অসুবিধা যাচাই করতে প্রথমে একটি পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

চাকরিপ্রার্থীরা সরকারের এই বিশাল নিয়োগের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে শঙ্কিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চাকরিপ্রার্থী জানান, দেশে সরকারি যেকোনো নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে পরীক্ষা নেওয়া এবং চূড়ান্ত ফল প্রকাশ, ভেরিফিকেশন ও পদায়ন হতে বছরের পর বছর কেটে যায়। অনেক সময় মামলা বা প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে থাকে। এই বিশাল স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে যাতে এমন দীর্ঘসূত্রতা তৈরি না হয়, সেদিকে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে বলে তাঁরা মনে করেন।