২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রক্তক্ষয়ী দিন। পূর্ববর্তী দিনে পুলিশি অভিযানের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ফাঁকা হয়ে গেলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠে নামেন। সকাল থেকেই বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। মেরুল বাড্ডা এলাকায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ে পুলিশ। আন্দোলনকারীরা বাইরে অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে পুলিশের ছোড়া ছররা ও রাবার বুলেটে অনেক শিক্ষার্থী আহত হন। তবে পুলিশ সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে পারেননি। অবশেষে বেলা তিনটার কিছু আগে দুটি হেলিকপ্টার এসে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
এদিন বাড্ডা ছাড়াও রাজধানীর উত্তরা, রামপুরা, মালিবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুর, নীলক্ষেত, আজিমপুর, তেজগাঁও, শান্তিনগর, মহাখালী, শনির আখড়া, কাজলা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। দিনভর এসব এলাকা রণক্ষেত্রের মতো হয়ে ওঠে। ঢাকার বাইরেও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, রাজশাহীসহ প্রায় সারা দেশে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এদিন সারাদেশে ২৭ জন শহীদ হন—ঢাকায় ১৯ জন এবং বাইরে ৮ জন। আহত হন প্রায় দেড় হাজার মানুষ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল পুলিশ-বিজিবি-র্যাব ও সোয়াটের হামলার প্রতিবাদ, খুনিদের বিচার, সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার। সর্বাত্মক অবরোধের কারণে ঢাকাসহ সারাদেশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। সড়ক ও রেলপথ অবরোধের ফলে ঢাকার সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর মেট্রোরেল বন্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভির কার্যালয়ে কয়েক দফায় হামলা হয় এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সাতটায় বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। সেতু ভবন, দুর্যোগ ভবন, বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা ও মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় হামলার খবর পাওয়া যায়।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারাদেশে বিজিবি মোতায়েন করে। সেদিন রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, এর আগে ১৭ জুলাই রাতে মুঠোফোন ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। ফলে ১৮ জুলাই দেশ পুরোপুরি ইন্টারনেটবিহীন হয়ে পড়ে। রাত ১২টায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া জানান, ১৯ জুলাইও সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন চলবে। তিনি তার বইয়ে লেখেন, ‘আমাদের অবস্থান ছিল, এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ার পর আন্দোলনটা শুধু কোটায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।’
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে ১৮ জুলাইয়ের ঘটনা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, সেনাবাহিনী, ডিজিএফআই ও অন্যান্য নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ‘কোর কমিটির’ সভায় নির্বিচার গ্রেপ্তার অভিযানের (ব্লক রেইডসহ) বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মন্ত্রীর নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয় এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন গোপন করার চেষ্টা করা হয়।



