মাছের বাজারে ছুরি মাছের চকচকে রূপালি রং দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এই মাছ কি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে? সরাসরি উত্তরটি হলো, না। বাংলাদেশের উপকূলে পাওয়া ছুরি মাছের বৈজ্ঞানিক নাম লেপ্টুরাক্যান্থাস স্যাভালা। ট্রাইচিউরিডি পরিবারের এই মাছটিকে ইংরেজিতে হেয়ারটেইল বা রিবনফিশ বলা হয়। শরীরের গঠন ছুরির ফলার মতো চ্যাপটা, ধারালো ও লম্বা ফিতার মতো হওয়ায় এর এমন নামকরণ। তবে এর দেহে কোনো বৈদ্যুতিক অঙ্গ বা ইলেকট্রোসাইট নেই বলেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো জৈবিক ব্যবস্থা তার শরীরে অনুপস্থিত।

প্রশ্নটি নিয়ে এগোলে অবশ্য প্রকৃতির এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করা যায়, যেখানে কিছু মাছ নিজের শরীরকে আস্ত ব্যাটারিতে রূপান্তরিত করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার নদীতে বসবাসকারী ইলেকট্রিক ইল সেই জগতের সবচেয়ে পরিচিত নাম। বৈজ্ঞানিক নাম ইলেকট্রোফোরাস ইলেকট্রিকাস হলেও মজার বিষয় হলো, এটি আদতে ইল বা বাইনজাতীয় কোনো মাছ নয়। জীববিজ্ঞানীদের ভাষায় এটি একধরনের নাইফফিশ, যা জিমনোটিফর্মেস বর্গের সদস্য। দূরসম্পর্কের এই দুটি মাছের মধ্যে কিছুটা বাহ্যিক মিল থাকলেও ভেতরের গঠনগত দিক থেকে এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ইলেকট্রিক ইলের আসল কাহিনি শুরু হয় পেশিকোষের অসাধারণ এক রূপান্তরের মাধ্যমে। শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ জুড়ে তিনটি বৈদ্যুতিক অঙ্গ রয়েছে—মেইন অর্গান, হান্টারস অর্গান ও স্যাকস অর্গান। বিজ্ঞানের ভাষায় বদলে যাওয়া এই পেশিকোষগুলোকে বলা হয় ইলেকট্রোসাইট। একক একটি কোষ মাত্র ০.১ থেকে ১.৫ ভোল্টের মতো সামান্য শক্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু শরীরে হাজার হাজার কোষ স্তম্ভের মতো সাজানো থাকায় স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম আয়নের চলাচলে মুহূর্তেই বিপুল বৈদ্যুতিক শক তৈরি হয়। ইলেকট্রোফোরাস ভোল্টাই প্রজাতিটি সবচেয়ে শক্তিশালী এবং এটি প্রায় ৮৬০ ভোল্ট পর্যন্ত শক দিতে সক্ষম, যা ঘরের সাধারণ বৈদ্যুতিক প্লাগের চেয়েও প্রায় চার গুণ বেশি। নিজের এমন শক্তিশালী বিদ্যুৎ প্রয়োগের পরও ইল অক্ষত থাকে, কারণ এর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো মাথার কাছে অবস্থিত এবং শকের বড় অংশ পানির মধ্য দিয়ে শরীরের বাইরে প্রবাহিত হয়।

শক্তিশালী শকদাতা মাছের পাশাপাশি আরেকটি নীরব জগৎ রয়েছে—দুর্বল বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী মাছেরা। এদের লেজের কাছের ছোট অঙ্গ থেকে ক্রমাগত মিলিভোল্ট মাপের দুর্বল তরঙ্গ নির্গত হয়, যা চারপাশে অদৃশ্য বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। রাতের অন্ধকারে এই ক্ষেত্রই তাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হিসেবে কাজ করে; কোনো শিকার বা শত্রু এলে ক্ষেত্রে বিকৃতি ঘটে, যা ত্বকের সংবেদী কোষ ধরে ফেলে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ইলেকট্রোলোকেশন। এছাড়া এই তরঙ্গ দিয়ে তারা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগও করে, কারণ প্রতিটি মাছের নিজস্ব বৈদ্যুতিক স্বাক্ষর থাকে। কাছাকাছি কম্পাঙ্কের কারণে সংকেত গুলিয়ে গেলে তারা নিজেদের তরঙ্গ বদলেও নেয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী মাছের এই জগৎ মানুষের কাছে নতুন নয়; বোঝার ভাষাটাই কেবল বদলেছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মিসরীয়রা ইলেকট্রিক ক্যাটফিশ চিনত এবং ব্যথা কমাতে এর শক ব্যবহার করত। প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসক হিপোক্রেটিস টর্পেডো মাছের কথা উল্লেখ করেছেন, যার নামের অর্থই হলো অসাড় হওয়া। রোমান চিকিৎসকেরা বাত ও মাথাব্যথার চিকিৎসায় এই মাছ ব্যবহার করতেন। তবে সবচেয়ে বড় অবদান চিকিৎসাশাস্ত্রে নয়, বরং ব্যাটারির জন্মে। আঠারো শতকে আলেসান্দ্রো ভোল্টা ইলেকট্রিক ইলের বৈদ্যুতিক অঙ্গের গঠন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ধাতু ও নোনাজলে ভেজানো কাপড়ের স্তর সাজিয়ে ভোল্টাইক পাইল তৈরি করেন, যা ছিল পৃথিবীর প্রথম একটানা বিদ্যুৎপ্রবাহ দিতে সক্ষম ব্যাটারি।