মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার জেরে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ পুনরায় কার্যকর করেছে ওয়াশিংটন। এরই পাশাপাশি বিমান হামলার মাত্রাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির একটি সেনা ব্যারাক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এতে কমপক্ষে সাতজন সেনা নিহত এবং ২৬০ জনের বেশি আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বাধ্যতামূলক সেনাসদস্য ও পেশাদার সেনা উভয়ই রয়েছে।

ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর বলেছেন, কেবল গত রাতের হামলাতেই ২৬০ জন আহত হয়েছেন—যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক যেকোনো সংঘর্ষের তুলনায় অনেক বেশি। তিনি নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেননি। ইরানি সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মাধ্যমে জানিয়েছে, ‘আমেরিকান শত্রুর এই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের তারা চূড়ান্ত জবাব দেবে।’

যুক্তরাষ্ট্র বুধবার দিনের বেলাতেও হামলা চালিয়েছে—যা একটি অস্বাভাবিক ঘটনা এবং সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি বন্দরে অবরোধ পুনরায় কার্যকর করার ১৭ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অবরোধ ভাঙার চেষ্টাকারী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল গ্রেটার টুনব দ্বীপ, যা হরমুজ প্রণালীতে কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত। সেখানে ইরানের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে। ১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইরান এই দ্বীপসহ তিনটি দ্বীপ দখল করে নেয়, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে।

এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী। শান্তিকালে বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ এই পথে চলাচল করে। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই পথ কার্যত বন্ধ করে দেয়, যা তেল ও সারসহ নানা পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে আকাশচুম্বী করে তোলে এবং ইরানকে আলোচনায় বড় ধরনের সুবিধা দেয়। মধ্যবর্তী চুক্তির সময় যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ওমানের কাছ দিয়ে একটি বিকল্প রুটে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করলেও সম্প্রতি ইরান সেই রুটেও হামলা চালিয়েছে। এর জেরেই পাল্টা হামলা চলছে।

ইরানের আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুমকি দিয়েছে, এই অবরোধের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাদের বক্তব্য, ‘এই অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় সবার জন্য হবে, নয়তো কারো জন্যই হবে না।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আগামী দু'দিনের মধ্যে আরও হামলা চালানো হবে এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে যদি না আলোচনা পুনরায় শুরু হয়। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘তোমরা চুক্তি না করলে কিছুই পড়বে না।’

ইরানের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই আগ্রাসী, শিকার নয়।’ মধ্যবর্তী চুক্তি ভেঙে পড়ার পর ষাট দিনের আলোচনার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সংঘাত আরও ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, তেলের উদ্বৃত্ত থাকায় দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সেই সক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে। মজুত কমে যাওয়ায় পরবর্তী ধাক্কার জন্য বিশ্ব আরও দুর্বল অবস্থায় পড়বে। আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।