ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ধর্মীয় ভেদাভেদ, জাতিভেদ প্রথা ও ইংরেজ আধিপত্যের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের জাতীয় জীবনে চলছিল এক মহা অন্তর্ঘাতকাল। ওই সময় নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। বাল্যবিবাহ, অকাল বৈধব্য, অশিক্ষা ও কুসংস্কারের বেড়াজালে বন্দি ছিল নারীসমাজ। ঠিক এমন এক ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে বাংলার এক নিভৃত পল্লীতে আবির্ভাব ঘটে এক মহীয়সী নারীর, যিনি গ্রামীণ পরিবেশে থেকেও প্রত্যহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন এক বৈপ্লবিক চিন্তার স্বাক্ষর রেখে গেছেন যা তৎকালীন শিক্ষিত প্রগতিশীল পুরুষদের কাছেও ছিল অভাবনীয়। তাঁর জীবনচর্যায় প্রাচীন ভারতীয় জীবনাদর্শ ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সামঞ্জস্য ঘটেছিল। তিনি ভারতীয় নারী জাগরণের এক জাগ্রত প্রতিমূর্তি। তিনি শ্রীমা সারদা দেবী, জগদ্বতার শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সহধর্মিনী ও সাধনসঙ্গিনী। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তিনি ‘সঙ্ঘজননী’ হিসেবে পরিচিত। ভক্তদের কাছে তিনি ‘শ্রীশ্রীমা’ নামে সমধিক খ্যাত। ১৮৫৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে তার জন্ম। পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী। মাত্র ছয় বছর বয়সে ১৮৫৯ সালে দক্ষিণেশ্বরের সাধক ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলেও শিশু হওয়ায় তিনি বাবা-মার তত্ত্বাবধানেই জয়রামবাটীতে থাকেন। ১৮৬৭ সালে চৌদ্দ বছর বয়সে কামারপুকুর গ্রামে ঠাকুরকে প্রথম দর্শন করেন সারদা। সেখান থেকে তৎক্ষণাৎ ঠাকুর তাঁকে স্নেহের সাথে গ্রহণ করে পার্থিব ও পারমার্থিক সব বিষয়ে শিক্ষা দিতে শুরু করেন। ১৮৭২ সালে, দীর্ঘ চার বছর পর, আঠারো বছর বয়সে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আসেন। নবযৌবনসম্পন্না সহধর্মিণীকে দেখে ঠাকুর তাঁর পায়ে পরে বলে ওঠেন— ‘মা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক মেয়ের মধ্যেই তিনি বিরাজ করেন, আমিও শিখে নিয়েছি প্রত্যেক মেয়েকে জননী হিসেবে দেখতে। এইভাবে আমিই তোমাকে দেখতে চাই, কিন্তু তুমি যদি আমাকে টেনে আনতে চাও, আমি তোমার কথা শুনবো, কারণ আমি তোমাকে মন্ত্রসাক্ষী রেখে বিয়ে করেছি।’ স্বামীর মনোভাব বুঝতে পেরে শ্রীমা উত্তরে বলেছিলেন, ‘জোর করে আপনাকে সংসারী করবার ইচ্ছা আমার নেই, আমি কেবল কাছে থেকে আপনার সেবা করতে চাই, আপনার কাছে সাধনভজন শিখতে চাই।’ জগজননীর বিশেষ ইচ্ছায় দক্ষিণেশ্বরে তাঁর আগমন ঘটেছিল। কারণ ঠাকুর দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছিলেন যে, তাঁর প্রযাণের পর আধ্যাত্মিক প্রচারকার্যের ভার বহন করবেন সারদা দেবী। সেই লক্ষ্যে ঠাকুরের সান্নিধ্যে শ্রীমা ব্যবহারিক জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সাধনায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ঠাকুর তাঁর অন্তরের মাতৃভাবের বিগ্রহরূপে শ্রীমাকে গড়ে তোলেন। ১৮৭২ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের ফলহারিণী কালিকাপূজার দিনে ঠাকুর শ্রীমাকে ষোড়শোপচারে দেবীজ্ঞানে পুজো করেন। সেদিন শ্রীমা জগদম্বার মতো বসন-অলঙ্কারে ভূষিত হয়ে অধিষ্ঠান করলেন আলপনা আঁকা পিঁড়িতে। ‘ত্রিপুরেশ্বরী’ সম্বোধন করে ঠাকুর মন্ত্র পাঠ করে পুজো শেষে তাঁর চরণে সমর্পণ করলেন নিজের সাধনফল। শ্রীমার মধ্যে জগজ্জননীকে আহ্বান করে ‘মা সারদা’-রূপে তাঁকে জগৎকল্যাণের পথে এগিয়ে দিলেন। ঠাকুরের তিরোধানের পর, তিনি সকলের মা হয়ে ওঠেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে অঙ্কুরিত ধর্ম আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। সেযুগের ছুঁতমার্গ ও রক্ষণশীলতার গণ্ডি অতিক্রম করে জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভক্তকেই পরম স্নেহে নিজ সন্তানের মতো গ্রহণ করেন। তিনি বলতেন, ‘আমি সত্যকারের মা; গুরুপত্নী নয়, পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়, সত্য জননী।’ স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীমাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতেন এবং বলতেন, ‘উনি এতই কৃপাময়ী, কোমলপ্রাণা, স্নেহাতুরা যে, কেউ ওঁর পাদপদ্ম স্পর্শ করলে উনি তৎক্ষণাৎ তাঁর জ্বালা-যন্ত্রণাকে টেনে নেবেন নিজের মধ্যে।’ প্রথাগত শিক্ষা ন্যূনতম সুযোগ না পেলেও আপাতসাধারণ গ্রাম্য নারী হয়েও শ্রীমা যেভাবে গভীর দর্শনের কথা বলে গেছেন তা বিস্ময়কর। তাঁর জীবনকেন্দ্রে ছিল দয়া, ভালোবাসা, ক্ষমা ও ঈশ্বরে আত্মনিবেদন। তিনি বলতেন, ‘ভালোবাসায় সবকিছু হয়, জোর করে কায়দায় ফেলে কাউকে দিয়ে কিছু করানো যায় না।’ তাঁর প্রধান শিক্ষা হলো—পরনিন্দা না করে নিজের দোষ খোঁজা। ‘যদি শান্তি চাও, মা, কারো দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার ক'রে নিতে শেখো।’ পদ্মপাতায় জলের মতো সংসারে থেকেও নির্লিপ্ত থাকার শিক্ষা দিতেন। নারীজাতির সার্বিক উন্নতিতে তাঁর চিন্তা ছিল আধুনিক। তিনি মনে করতেন, নারীশিক্ষার প্রসার না ঘটলে নারীরা নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তাই মেয়েরা লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হোক, এই কামনা করতেন। নারীশিক্ষা প্রসারে ভগিনী নিবেদিতাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘তাঁর আবির্ভাব ভারতবর্ষের ইতিহাসে নবযুগের সূচনা করেছে। যে আদর্শকে তিনি জীবনে উপলব্ধি করেছেন, তার প্রকাশ সমগ্র পৃথিবীর নারীদের মন ও হৃদয়ে প্রবেশ করে তাদের প্রভাবিত করবে।’ কল্যাণময়ী এই মহিয়সী ১৯২০ সালের ২০ জুলাই রাত ১টা ৩০ মিনিটে কলকাতার উদ্বোধন ভবনে মহাসমাধি লাভ করেন।