প্রায় আটশ বছর আগে সিরিয়ার দামেস্কে বসবাস করতেন এক অসাধারণ নারী—জয়নাব বিনতে কামাল। যুগটিতে উড়োজাহাজ বা দ্রুতগামী যানবাহন ছিল না, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। তথাপি তাঁর হাদিস শিক্ষার সুনাম শুনে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন জ্ঞানপিপাসুরা। সমকালে তাঁকে ‘মুসনিদাতুশ শাম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, অর্থাৎ তিনি ছিলেন তৎকালীন বৃহত্তর শাম অঞ্চলের ধর্মীয় জ্ঞানের প্রধান কেন্দ্র। ইতিহাসে তিনি ‘চিরকুমারী মুহাদ্দিসা’ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, বিবাহের ব্যস্ততা যাতে জ্ঞানার্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, সেজন্যই তিনি সারাজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কের বিখ্যাত আল-মাকদিসা পরিবারে তাঁর জন্ম। এই পরিবার হাম্বলি মাজহাবের মূল উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখান থেকে শতাধিক প্রাজ্ঞ আলেম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অত্যন্ত মেধাবী ও প্রখর ধীশক্তির অধিকারী জয়নাব মাত্র দুই বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু চোখের আলো না থাকলেও জ্ঞানের প্রতি তাঁর তৃষ্ণা ছিল অপরিসীম। ওস্তাদদের মুখ থেকে শুনে শুনেই তিনি অসংখ্য হাদিস ও ইসলামি পাণ্ডুলিপি মুখস্থ করে ফেলেন। কেবল নিজ শহরেই সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি দীর্ঘ দেশভ্রমণেও বের হন।

শৈশবে পিতা তাঁকে তৎকালীন প্রখ্যাত নারী শিক্ষাবিদ শাইখা হাবিবা বিনতে আবি ওমরের পাঠশালায় ভর্তি করেন। ইলম ও আধ্যাত্মিকতার পবিত্র পরিবেশে লালিত-পালিত হন তিনি। বর্তমান তুরস্কের মারদিন শহরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুল খালিক আল-নিশতিবির কাছ থেকে মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রথম ‘ইজাজাহ’ বা হাদিস বর্ণনার আনুষ্ঠানিক লিখিত অনুমতি লাভ করেন। এরপর দামেস্ক থেকে বাগদাদ, হালব, হারান, কায়রো ও আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে তিনি জ্ঞানার্জনের সফর করেন। শৈশবেই বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস ও শাইখদের সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি, যা তাঁকে পরবর্তীকালে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদে পরিণত করে।

দামেস্কে তিনি সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ ইসলামের প্রধান হাদিস গ্রন্থগুলোর নিয়মিত পাঠদান করতেন। তাঁর ক্লাসে হাজারো নারী-পুরুষ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও শৈলী ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তিনি ক্লান্তিহীনভাবে দিনভর পড়াতেন এবং কখনো শিক্ষার্থীদের ভিড়ে বিরক্ত হতেন না। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে তিনি প্রায় চার শতাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসের মূল কিতাব পড়িয়েছেন।

জয়নাবের ছাত্রদের তালিকা বিস্ময়কর। হাদিস ও ইতিহাস শাস্ত্রের কিংবদন্তি ইমাম শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি (রহ.) ছিলেন তাঁর প্রধান ছাত্র। ইমাম জাহাবি তাঁর শিক্ষিকা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি সুন্নাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, অত্যন্ত ধার্মিক ও বিনয়ী রমণী। তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। শিক্ষার্থীরা তাঁকে গোল করে ঘিরে ধরতেন এবং তিনি বড় বড় মূল গ্রন্থ থেকে হাদিস পড়ে শোনাতেন।’ তাঁর আরেক ছাত্র ইবনে রাফি সুল্লামি বলেন, ‘তিনি একজন অত্যন্ত নেককার ও সৎ শিক্ষিকা, উচ্চ সনদধারী ও দীর্ঘায়ু নারী। বিশ্বজুড়ে মানুষ তাঁর জ্ঞান থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে।’

হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.)-এর নিজ হাতে লেখা একটি প্রাচীন নোটে পাওয়া যায় যে তিনি জয়নাবের দরবারে বসে ইমাম মালিকের ‘মুওয়াত্তা’ গ্রন্থের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক পাঠটি অনুষ্ঠিত হয় দামেস্কের কাসিয়ুন পর্বতের নিকটবর্তী হানাবিলা মসজিদে। তাঁর নিয়মিত ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম হাফেজ জামালুদ্দিন আল-মিজ্জি এবং বিশ্ববিখ্যাত মহান ঐতিহাসিক ও পর্যটক ইবনে বতুতা।

রক্ষণশীল যোগাযোগব্যবস্থার যুগে একজন দৃষ্টিহীন নারী হয়েও জয়নাব বিনতে কামাল যে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ, সামাজিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতা অর্জন করেছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর বাহ্যিক অবয়বে নয়, বরং গভীর ইলম, তাকওয়া এবং সমাজ ও উম্মাহর জন্য অক্ষয় অবদানে। ৭৪০ হিজরিতে ৯৪ বছর বয়সে দামেস্কে এই মহান মুহাদ্দিসা ইন্তেকাল করেন।