দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রচলিত ধারা থেকে সরে এসে কারিগরি শিক্ষার দিকে ঝোঁক বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে চাকরির বাজার যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে চার বছরের কলেজ ডিগ্রিকে আর নিরাপদ পথ হিসেবে দেখছেন না তারা। এর পরিবর্তে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বিষয়ক ভোকেশনাল স্কুলে ভর্তি হচ্ছেন অনেকেই। ভোট দেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই ছয় অঙ্কের বেতনের চাকরি নিশ্চিত করছেন তারা।

সিউলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চুংবুক সেমিকন্ডাক্টর হাইস্কুলের ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতক হওয়ার আগেই চাকরির প্রস্তাব পাচ্ছে। স্কুলটিতে ইলেকট্রনিক সার্কিট ডিজাইন, ক্লিনরুম প্রোটোকল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবহারিক দক্ষতার পাশাপাশি ক্যালকুলাস ও রসায়নের মতো তাত্ত্বিক বিষয়ও পড়ানো হয়। ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নো জুন-সিক জানিয়েছে, সে ইতিমধ্যে স্যামসাংয়ে চাকরি পেয়েছে। তার বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে এখন অনুশোচনা করছে বলে জানায় সে। স্কুলটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী সরাসরি স্যামসাংয়ে নিয়োগ পায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম কোম্পানি স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সে কর্মীদের গড় বার্ষিক বেতন ১৫৮ মিলিয়ন উন বা প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ৩০০ ডলার। সর্বশেষ ইউনিয়ন চুক্তি অনুযায়ী, সেমিকন্ডাক্টর বিভাগের কর্মীরা—এমনকি অ্যাসেম্বলি লাইন অপারেটররাও—মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করলে আগামী বছর ৪ লাখ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারেন।

এআই যুগে স্নাতকদের জন্য চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়লেও সেমিকন্ডাক্টর খাতে ছয় অঙ্কের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্নাতক ডিগ্রিধারী ৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ বেকার ছিল—গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। এআই এন্ট্রি-লেভেল নিয়োগে প্রতিযোগিতা আরও বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুধু দক্ষিণ কোরিয়া নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা মহামারির বাইরে ২০১৫ সালের পর সর্বোচ্চ। তরুণদের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন চাকরির বাজার প্রায় ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, এআই অবকাঠামো তৈরির জন্য সেমিকন্ডাক্টর কারখানা ও ডেটা সেন্টারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে। টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা, নিউ ইয়র্ক ও ওহাইওতে ইলেকট্রিশিয়ান, টেকনিশিয়ান, নির্মাণশ্রমিক ও অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং বিশেষজ্ঞের চাহিদা বাড়ছে।

ম্যাককিনসে ও ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেবে। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই খাতের পাঁচজনে একজন কলেজ ডিগ্রি ছাড়াই কাজ করছে, আর ২০২০ সালে গড় বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

সেমিকন্ডাক্টর বুম শুধু একটি খাত নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষ শ্রমশক্তি পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। জেপি মর্গান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন সম্প্রতি জানিয়েছেন, জাহাজ নির্মাণ ও অন্যান্য বড় প্রকল্পের জন্য ৩ লাখ ইলেকট্রিশিয়ান ও ওয়েল্ডারের প্রয়োজন। তার প্রতিষ্ঠান ২৪ মিলিয়ন ডলারের ঋণ ও অনুদান দিয়ে একটি নতুন সাবম্যানুফ্যাকচারিং সুবিধা তৈরিতে সহায়তা করছে, যা ৪৫০টি স্থায়ী চাকরি সৃষ্টি করবে।

মার্ক জুকারবার্গের মেটাও ১১৫ মিলিয়ন ডলারের 'আমেরিকা'স ওয়ার্কফোর্স অ্যাকাডেমি' চালু করেছে। পাঁচ সপ্তাহের এই প্রশিক্ষণ শেষে ডেটা সেন্টার টেকনিশিয়ান হিসেবে চাকরি নিশ্চিত। অন্যদিকে, লোয়েস ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে প্লাম্বিং, কাঠমিস্ত্রি ও ইলেকট্রিক্যাল কাজে ২ লাখ ৫০ হাজার দক্ষ শ্রমিক তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। লোয়েসের প্রধান নির্বাহী মারভিন এলিসনের মতে, এআই যুগে প্রশাসনিক ও বিশ্লেষণধর্মী পেশাগুলোয় স্বয়ংক্রিয়তা বাড়বে, তাই দক্ষ শ্রমের গুরুত্ব আরও বাড়বে।