লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ২০২০ সালে ২০ বছর বয়সী ফাতেমা আক্তারের মৃত্যুকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাঁকে মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হত্যা মামলা দায়ের হলেও অদ্যাবধি রহস্যের জট খোলেনি। মামলাটি এখন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে থাকলেও ছয় বছরেও তারা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। এর মধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলেছেন মোট আটবার — প্রথমে পুলিশ ও ডিবিতে তিনজন, পরে সিআইডিতে পাঁচজন। প্রতিবার নতুন কর্মকর্তা আসার পর তদন্ত যেন নতুন করে শুরু হয়, এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের তরফ থেকে বারবার বলা হয়েছে তদন্ত শেষ পর্যায়ে, কিন্তু সেই 'শেষ পর্যায়' আর শেষ হয় না।

ঘটনাটি ঘটে ২০২০ সালের ১৯ জুলাই রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের লুদুয়া গ্রামের ভূঁইয়াবাড়িতে। ফাতেমা সেদিন বাড়িতে একা ছিলেন। মৃত সিরাজুল ইসলামের মেয়ে ফাতেমাকে ওই দিনই নিজ বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়, কারণ তখন পরিবারের দাবি ছিল, প্রতিবেশীরা পারিবারিক শত্রুতার জেরে তাঁকে খুন করেছে এবং খুনিরা আত্মহত্যার গুজব ছড়িয়েছে। দুই মাস পর, ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট রায়পুর থানায় পাঠানো ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২৯ আগস্ট ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা বাদী হয়ে রায়পুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, পারিবারিক বিরোধের জেরে ফাতেমাকে নিজ কক্ষে হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এই ঘটনায় একই বাড়ির রায়হান, রাইমা বেগম, শারমিন আক্তার, মো. ইয়াসিনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পুলিশ প্রধান আসামি রায়হানকে গ্রেপ্তার করলেও পরে তিনি আদালত থেকে জামিন লাভ করেন।

মামলার তদন্তভার পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন, যেখানে বলা হয়েছিল, হত্যার ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, নির্ভরযোগ্য বা পরোক্ষ সাক্ষী পাওয়া যায়নি এবং অন্য কোনো ব্যক্তি ফাতেমাকে হত্যা করেছেন এমন তথ্যও মেলেনি। ফলে ভবিষ্যতে মামলায় সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও উল্লেখ করা হয়। এই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হতে পারেনি ফাতেমার পরিবার। বাদী সারাবান তহুরা ২০২২ সালের ৫ মে এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দাখিল করেন। শুনানি শেষে আদালত ডিবির প্রতিবেদন বাতিল করে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। এরপর থেকে সিআইডি তদন্ত করলেও ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সমাধানসূত্র মেলেনি।

মামলার বাদী ও ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলানো হয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেন তদন্ত শেষ পর্যায়ে, আর নতুন কর্মকর্তা এসে নতুন করে তদন্ত শুরু করেন। ছয় বছর ধরে কেবল আশ্বাসই শুনেছেন তাঁরা। তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফাতেমার মা হাসনা বেগম মেয়ের মৃত্যুর পর থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিচার তো দূরের কথা, ছয় বছরেও মেয়েকে কে বা কেন হত্যা করেছে সেই রহস্যই উদঘাটন হয়নি। তবু মা হিসেবে আশা ছাড়তে পারেন না — খুনি যেন শিগগির শাস্তি পায়।

তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার ৬ নম্বর সাক্ষী রেহানুজ্জামান রনি ভূঁইয়াও। তাঁর অভিযোগ, ডিবি তদন্তের সময় কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে যথাযথ তদন্ত করেননি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হত্যার কথা স্পষ্ট উল্লেখ থাকার পরও হত্যাকারী শনাক্তে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তদন্ত না করেই মামলা নিষ্পত্তির আবেদন করা হয়েছে, যা তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক তদবিরের কারণে হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে, বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন সিআইডির ইন্সপেক্টর ওবায়দুল ইসলাম। তিনি জানান, গত ছয় মাস ধরে তিনি মামলাটি তদন্ত করছেন এবং নানান দিক থেকে সূত্র খোঁজার চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। তবে মামলার প্রধান আসামি মো. রায়হান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ফাতেমা আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক বিরোধের জেরে তাদের অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো ও হয়রানি করা হচ্ছে। সাবেক ডিবি কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেনও বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করেছেন এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।