বদর যুদ্ধের উদ্দেশ্যে মরুভূমির তপ্ত বালু মাড়িয়ে একদিন এগিয়ে চলেছিল ৩১৩ জনের একটি ছোট্ট কাফেলা। ভয়াবহ এক অসম লড়াই সামনে। দলের সামনে হাঁটছেন স্বয়ং নবীজি (সা.), যিনি একাধারে সেনাপতি এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ। কিন্তু বিপুল এই দীর্ঘ পথের জন্য রসদ একেবারেই সীমিত। তিন শতাধিক মানুষের জন্য উট ছিল মাত্র ৭০টি।

স্বভাবতই, তিনি নিজের আরামের চেয়ে সবার কথা ভেবেছেন। যাত্রার শুরুতেই একটি নিয়ম করে দেন: তিনজন করে পালাক্রমে একটি উটে চড়বেন। তাঁর নিজের পালার উটে দুই সঙ্গী ছিলেন আলী ও আবু লুবাবা (রা.)। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর কাফেলার গতি কিছুটা ধীর হয়, আর তখনই আসে নবীজির (সা.) হাঁটার পালা। তিনি উটের পিঠ থেকে নামতে উদ্যত হলেই দুই সাহাবির বুক কেঁপে ওঠে। তারা ভাবতে পারছিলেন না যে, এমন উত্তপ্ত বালুতে আল্লাহর রাসুল (সা.) পায়ে হেঁটে চলবেন আর তাঁরা আরামে বসে থাকবেন।

আকুলভাবে তাঁরা নবীজির নেমে পড়া ঠেকাতে চাইলেন। তাঁরা বললেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি উটেই বসে থাকুন। আপনার জন্য আমরা নিজেদের হাঁটার পালাও দিয়ে দিচ্ছি। আনন্দেই আমরা হেঁটে নেব, আমাদের কোনো কষ্ট হবে না।' কিন্তু রহমতের নবী (সা.) এই ভালোবাসা গ্রহণ করলেন না। তাঁর স্নেহমাখা মুখে ফুটে উঠল এক অমৃত-মধুর হাসি। তিনি দুই সাহাবির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা কি আমাকে থামাতে চাও? তোমরা তো আমার চেয়ে বেশি শক্তিমান নও। আর সওয়াবের দিক থেকে তোমরা যতটা আকাঙ্ক্ষা করো, আমি তোমাদের চেয়ে কিছু কম আকাঙ্ক্ষী নই।' (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৯০১)

মরুভূমির মর্মভেদী বাতাসে এই শব্দগুলো প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল। নবীজির এই সংলাপে ফুটে উঠল ভিন্ন এক শিক্ষা। নিজের বিপুল নবুয়তী মর্যাদা সত্ত্বেও তিনি পরকালের প্রতিদানের দৌড়ে কখনো নিজেকে পিছনে রাখতে নারাজ। তাঁর এই কথায় সাহাবিদের প্রতি গভীর মমতাও লুকিয়ে ছিল। তিনি আদৌ চাননি যে তাঁর প্রিয় সঙ্গীরা তাঁর কারণে বাড়তি কষ্টের ভার বইুক।

তখন নবীজির (সা.) বয়স ছিল ৫৫ বছর। এই বয়সেও তিনি সাধারণ সৈনিকদের মতো সাহাবাদের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের পথে হেঁটে চলেছেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৬০) বদরের পথ সেদিন এক ভিন্ন ইতিহাস দেখেছিল। সেখানে সেনাপতি ও সৈনিকের মধ্যে কোনো ভেদ ছিল না, ছিল কেবল সওয়াব অর্জনের এক মিষ্টি প্রতিযোগিতা আর পরস্পরের প্রতি অগাধ ভালোবাসার টান।