চলমান গ্রীষ্মকালে চরম তাপপ্রবাহ, তীব্র খরা এবং বিস্তৃত দাবানলের মুখে পড়ে যুগের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন-জুলাই মাস অতিক্রম করেছে পশ্চিম ইউরোপ। গতকাল সোমবার এমনটাই জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (সিসিএস)। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নশীল মহাদেশ হিসেবে পরিচিত ইউরোপে গ্রীষ্মের প্রথম দুই মাসে একের পর এক তাপপ্রবাহ ও চরম শুষ্ক আবহাওয়া দেখা গেছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাই মাসে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ২০২২ সালে হওয়া আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়াই এই রেকর্ড উচ্চতার মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছে সিসিএস। এমনকি ২০২২ সালের জুলাইয়ের ভয়াবহ খরার তুলনায় বর্তমানে পশ্চিম ইউরোপের মাটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা শুষ্ক পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইউরোপীয় সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) বিজ্ঞানী সামান্থা বার্গেস বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে চরম তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করে তুলছে, এটি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পাশাপাশি, তাপপ্রবাহ ও খরা পরস্পরকে শক্তিশালী করায় পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত জুলাই মাসে ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিসহ পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চরম শুষ্কতা বিরাজ করেছে। যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের কিছু অঞ্চলেও একই ধরনের পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে ফ্রান্সের সেইন, জার্মানির রাইন ও দানিউবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে গেছে, যা পরিবহন, সেচব্যবস্থা এবং জ্বালানি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই তীব্র গরম ও শুষ্কতা দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জন্যও অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফ্রান্স ও স্পেন সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও কানাডাতেও বড় বড় দাবানলের ঘটনা ঘটেছে।
কোপার্নিকাসের তথ্য বলছে, ইউরোপের আশপাশের সমুদ্রাঞ্চলে তাপপ্রবাহ এবং প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে জুলাই মাসে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো বিশ্বের মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। জুলাই মাসে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২৩ সালে হওয়া আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেছেন, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের কিছু অংশে অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা গেলেও সমুদ্রের রেকর্ড তাপমাত্রার পেছনে মূল চালিকা শক্তি ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো। গত ৫ আগস্ট সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'আমরা এখন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর মুখোমুখি, যার তীব্রতা সম্ভবত নজিরবিহীন হতে পারে। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা প্রভাব এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।'
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায়, যা সাময়িকভাবে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা ঘটাতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এল নিনো আরও অতিরিক্ত তাপ যোগ করে। সাধারণত বছরের শেষ দিকে এল নিনোর সর্বোচ্চ তীব্রতা দেখা যায়, এরপর সমুদ্রে সঞ্চিত অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
এল নিনোর প্রভাবেই ২০২৩ ও ২০২৪ সাল যথাক্রমে রেকর্ডের দ্বিতীয় ও প্রথম উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেছেন, বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে গত জুলাই ছিল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুলাইগুলোর একটি, যেখানে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুর গড় তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পযুগের গড় তাপমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
বুয়োনতেম্পো আরও বলেন, রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলো গত ১১ বছরের মধ্যে এসেছে। তিনি বলেন, 'জীবদ্দশায় এত উষ্ণ জলবায়ু আমরা আগে কখনো দেখিনি। সম্ভবত মানবসভ্যতার ইতিহাসেও এমন উষ্ণ জলবায়ু আগে কখনো দেখা যায়নি। এই উষ্ণায়নের প্রধান কারণ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি।' মানবসৃষ্ট কার্বন নিঃসরণের ফলে উৎপন্ন অতিরিক্ত তাপের বেশির ভাগই মহাসাগরগুলো শোষণ করে নেয়, তবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শক্তিশালী ঝড়, অতিবৃষ্টি এবং প্রবালপ্রাচীরের ব্যাপক ক্ষয় বা বিবর্ণতার মতো নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। ১৯৪০ সাল থেকে জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে কোপার্নিকাস, যা কোটি কোটি উপগ্রহ ও আবহাওয়া–সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি।




