যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে সরকারি বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে মত দিয়েছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে এই চিত্র ফুটে উঠেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ মানুষ কঠোর নজরদারির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন, যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করার আইন চান ৬৬ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৫ শতাংশ মানুষই মনে করেন, শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তিকর হতে পারে।
গত ৩ আগস্ট শেষ হওয়া ছয় দিনব্যাপী এই অনলাইন জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজার ৫০৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। জরিপের ফলাফলে ত্রুটির মাত্রা ২ শতাংশ পয়েন্ট। এই জরিপের ফল প্রকাশ এমন এক সময়ে হলো, যখন মেটা ও ইউটিউবের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো তরুণ ব্যবহারকারীদের নিয়ে তাদের কার্যক্রমের কারণে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একাধিক অঙ্গরাজ্যের কৌঁসুলিরা অভিযোগ তুলেছেন যে, মেটার পণ্যগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে তরুণরা আসক্ত হয়ে পড়ে এবং এই মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা আগামী বুধবার।
নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত গত বৃহস্পতিবার মেটাকে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য তহবিলে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত তাদের রায়ে শিশুদের সুস্থতার ক্ষতির জন্য মেটাকে দায়ী করেন। যদিও ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং সতর্ক করে বলেছে, মামলাগুলোতে তারা পরাজিত হলে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হতে পারে।
দেশজুড়ে তরুণদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে জবাবদিহির দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২টিরও বেশি অঙ্গরাজ্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন করেছে। তবে মেটা, টিকটক ও স্ন্যাপের মতো কোম্পানিগুলোর সমর্থনপুষ্ট বাণিজ্যিক সংগঠন ‘নেটচয়েস’ বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করার আইন ঠেকাতে আদালতে গেছে। তাদের যুক্তি, এ ধরনের আইন বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা লঙ্ঘন করে।
জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দলীয় মতাদর্শ অনুযায়ী সমর্থনের তারতম্য রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৭১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে ৬২ শতাংশ কঠোর নজরদারির পক্ষে। তবে স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে এই সমর্থন তুলনামূলক কম। বয়স যাচাইয়ের প্রস্তাবটি সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে—৭৪ শতাংশ, আর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার ৬৯ শতাংশ।
টেনেসির ৬০ বছর বয়সী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জেমস বসারডেট, যিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন, তিনি সাধারণভাবে সরকারের ছোট ভূমিকা পছন্দ করেন। তবে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে তাঁর মত আলাদা। তিনি বলেন, ‘কাউকে না কাউকে তো এটা করতেই হবে। এটা কি সরকারের কাজ? সরকারের কাজ হোক—তা আমি চাই না। তবে আমার মনে হয়, হয়তো হওয়া উচিত।’
অন্যদিকে ওয়াশিংটন ডিসির ৩৪ বছর বয়সী বাসিন্দা ক্রিস্টোফার চেন মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো কিশোরদের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছে। তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণের ধরনটা কেমন হবে, তা আমি জানি না। তবে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কিছু একটা করা দরকার।’ ২০২৪ সালের নির্বাচনে কমলা হ্যারিসকে ভোট দেওয়া চেনের মতে, এসব অ্যাপে ব্যবহারকারীরা কী দেখবেন তার ওপর কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
কানসাসের ৭৩ বছর বয়সী পলা ডিক বলেন, অনুপযুক্ত কনটেন্ট থেকে শিশুদের দূরে রাখতে কোম্পানিগুলোর আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তিনি জানান, নাতি-নাতনিদের দেখাশোনার সময় তিনি তাদের ইউটিউব ব্যবহার করতে দেন না, কিন্তু তারা কোনো না কোনো উপায়ে সেটি ব্যবহারের পথ খুঁজে নেয়। ট্রাম্প সমর্থক ডিকের মতে, শিশুরা বুদ্ধিমানের মতো বাবা-মায়ের ব্লক এড়িয়ে যাওয়ার পদ্ধতি বের করে ফেলে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উপভোগ করেন। ৭০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, এসব প্ল্যাটফর্মে সময় কাটিয়ে তারা আনন্দ পান। তবে ৩৫ শতাংশ মানুষ মানসিক চাপ অনুভব করেন বলেও জানিয়েছেন। অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—৫২ শতাংশ স্বীকার করেছেন যে তারা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন, অন্যদিকে ৪৩ শতাংশ বলেছেন বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।




