বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণকেন্দ্র বিএফডিসি এখন চরম অবহেলায় ধুঁকছে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের শুটিং ফ্লোরগুলো বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকায় বর্ষা এলেই যেন আতঙ্ক নেমে আসে। সংস্কারের অভাবে ফ্লোরগুলোর ছাদ দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

প্রতিষ্ঠানটির মোট ৯টি শুটিং ফ্লোরের মধ্যে বর্তমানে কার্যকর রয়েছে মাত্র পাঁচটি। বাকিগুলোর অবস্থা এতটাই নাজুক যে সেগুলোকে গুদাম বা স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২ নম্বর ফ্লোর, যা মুক্তিযোদ্ধা চিত্রনায়ক জসীম ফ্লোর নামে পরিচিত, তার ছাদ দিয়ে পানি পড়ে মেঝে ভেসে যাওয়ার ছবি সম্প্রতি দেখা গেছে। ৭ নম্বর ফ্লোরের তালা খুলতে গিয়ে কর্মীদের বেগ পেতে হয়; ভেতরের পরিবেশ ভুতুড়ে ও ধুলোয় জর্জরিত।

গত ৫ এপ্রিল বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে জরুরি মেরামতের জন্য ১ কোটি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা চেয়ে চিঠি দিলেও এখনো কার্যকর কোনো বরাদ্দ আসেনি। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে আশ্বাস পাওয়া গেলেও বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি নেই।

নির্মাতারাও বিএফডিসির সেবা নিয়ে হতাশ। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত 'বনলতা এক্সপ্রেস' সিনেমাটির পরিচালক তানিম নূর জানান, বিএফডিসির বড় ফ্লোর না পেলে সিনেমাটি নির্মাণ সম্ভব হতো না। তবে টয়লেটের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, তীব্র গরম ও পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে বারবার সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বাইরে থেকে ক্যামেরা ও সরঞ্জাম ভাড়া আনা বাধ্যতামূলক হয়েছিল, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

আর্থিক সংকটও ভয়াবহ। বর্তমানে বিএফডিসির মাসিক ব্যয় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাছাকাছি, অথচ আয় গড়ে মাত্র ৩০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। ফ্লোর ভাড়া থেকেই আয়ের বড় অংশ আসে, কিন্তু ফ্লোরগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণে নির্মাতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের কর্মী পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশল) মামুনূর রশীদ জানান, ২০০৭-০৮ সাল পর্যন্তও ফ্লোরগুলো ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকত। এক দলের কাজ শেষ হওয়ার আগেই আরেক দল চলে আসত, এমনকি মারামারিও লেগে যেত। এখন তালা খোলার জন্যই হিমশিম খেতে হয়। এই পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার ফল বলে মনে করেন তিনি।

বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে ১১৮ কোটি ৭ লাখ টাকার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেখানে বেতন, অবসর সুবিধা ও প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৮ সালে নেওয়া বহুতল কমপ্লেক্স প্রকল্পের কাজ মাত্র ৫৩ শতাংশ শেষ হয়েছে এবং তা কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত।

১৯৫৭ সালে পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত বিএফডিসি একসময় চলচ্চিত্রের সব উপকরণ আমদানি ও সরবরাহের একচেটিয়া অধিকার ছিল। অ্যানালগ যুগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করতে দেরি হওয়ায় বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা এলেও ততদিনে বাজারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এর ল্যাব ও অন্যান্য বিভাগ বন্ধ থাকায় আয়ের পথ আরও সংকুচিত হয়েছে।

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত বিএফডিসির টিকে থাকা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সংস্কার ও বিনিয়োগ না হলে ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই কেন্দ্রীয় ভিত্তিটি পুরোপুরি ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।