দেশের অন্যতম পরিচিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা সিটি কলেজে নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের একাধিক প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। ১৪ জুলাই চূড়ান্ত করা এই প্রতিবেদনে মোট ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগকে বিধিসম্মত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকার ভ্যাট ও ২ লাখ ৯২ হাজার টাকার আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। পরিচালনা কমিটির সদস্যরা বিধিবহির্ভূতভাবে ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ বাবদ ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম ১৯ জুলাই এই প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি জানান, পরিদর্শনে প্রাপ্ত সব আপত্তি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের আগস্টে ডিআইএর তৎকালীন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান ও অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দেব এই পরিদর্শন পরিচালনা করেছিলেন।

প্রতিবেদনে ১০০ জন শিক্ষকের একটি তালিকা তৈরি করে বলা হয়েছে, তাদের নিয়োগে ১৯৮২ সালের নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হয়নি। শুধু সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। বিধি অনুযায়ী নিয়োগ কমিটিও গঠন করা হয়নি। পরিচালনা কমিটির অনুমোদনের প্রমাণও প্রদর্শন করা যায়নি। আরেকটি তালিকায় পাঁচজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাদের নিয়োগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, নিয়োগ কমিটি গঠন এমনকি সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়নি। প্রশ্নবিদ্ধ ১০৫ জনের মধ্যে ১৮ জন অধ্যাপক, বাকিরা সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ডেমোনস্ট্রেটর পদে রয়েছেন।

আর্থিক অনিয়মের অংশ হিসেবে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের সব অর্থ ব্যাংক চেকের মাধ্যমে না নিয়ে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বেশি নগদ হাতে রেখে ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ভ্যাট বাবদ ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকা এবং উৎসে কর্তন না করা ২ লাখ ৯২ হাজার টাকার আয়কর ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে বলা হয়েছে। পরিচালনা কমিটির সদস্যদের দেওয়া ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকার সিটিং অ্যালাউন্সকেও বিধিবহির্ভূত উল্লেখ করে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের স্টাফিং প্যাটার্ন যাচাই করে দেখা গেছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে ৩৪ জন অধ্যাপক ও ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।

তবে কলেজের পাঠ ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ডিআইএ। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান হয়। ২০২২ সালে পরিদর্শনের সময় শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৮১১ জন। কলেজটির নিজস্ব ৩৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ জমি ও ১৮০টি কক্ষ রয়েছে। পৃথক পাঠাগারে ২৪ হাজারের বেশি বই এবং পর্যাপ্ত বিজ্ঞানাগার ও যন্ত্রপাতি রয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গুণগত ও সংখ্যাগত মান সন্তোষজনক হলেও আরও উন্নতির জন্য শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী নেয়ামুল হকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কলেজটি আগে এমপিওভুক্ত ছিল, কিন্তু ১৯৯৯ সালে সেই সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে এটি এমপিওভুক্ত নয়।