প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত কৃমির ওষুধ সেবন কতটা জরুরি, তা নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও জীবনযাত্রার ওপর। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। শিশু-কিশোরদের মতো বড়দেরও কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক এই ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হতে পারে, তবে সেটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের প্রতিবছর কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর চল রয়েছে, এমনকি সংক্রমণের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ না থাকলেও। এর কারণ হলো, বাড়ন্ত বয়সে কৃমি সংক্রমণ পুষ্টিহীনতা ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু বড়দের জন্য আলাদাভাবে এমন কোনো সার্বিক নির্দেশনা নেই। স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের মেডিসিন বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. তাসনোভা মাহিন জানান, বড়দের মধ্যে কেবল নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর জন্যই প্রতিরোধমূলক ওষুধ জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম—যেমন ৬৫ বছর পেরোনো ব্যক্তি, কেমোথেরাপি বা দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েড সেবনকারী—তাঁদের ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া যাঁরা খালি পায়ে মাটিতে হাঁটেন বা কৃষিকাজের মতো পেশায় যুক্ত, তাঁদেরও কৃমি সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। গর্ভধারণে সক্ষম নারী এবং যেসব এলাকায় কৃমির প্রাদুর্ভাব বেশি, সেখানকার বাসিন্দারাও এই তালিকায় পড়েন। সরকারি উদ্যোগে কোনো এলাকার সবাইকে ওষুধ খাওয়ানোর কর্মসূচিও হতে পারে।

যাঁদের ওপরের কোনো ঝুঁকি নেই, তাঁদের জন্য নিয়মিত কৃমির ওষুধ সেবনের প্রয়োজন নেই বলে জানান চিকিৎসক। বরং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। খাবার তৈরির আগে ও পরে, খাওয়ার আগে এবং শৌচকর্মের পর ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাসনকোসন ও কাঁচা খাবার ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়াও জরুরি। খালি পায়ে মাটিতে হাঁটা এড়িয়ে চললে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

যাঁদের জন্য ডাক্তার কৃমির ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন, তাঁরা সাধারণত বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খান। তবে বাংলাদেশে যে ধরনের কৃমির প্রাদুর্ভাব রয়েছে, সেগুলো প্রতিরোধে অ্যালবেনডাজলের পাশাপাশি আইভারমেকটিন সেবনের প্রয়োজন হয়। আইভারমেকটিনের ডোজ নির্ভর করে শরীরের ওজনের ওপর—প্রতি কেজির জন্য ২০০ মাইক্রোগ্রাম। তাই সঠিক মাত্রা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

কৃমির ওষুধ কখন খাওয়া ভালো, তা নিয়ে দ্বিধার প্রয়োজন নেই। দুই বেলার খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে ওষুধ সেবন করাই উত্তম। যেমন এক বেলার খাবার খাওয়ার দুই-তিন ঘণ্টা পর ওষুধ খেয়ে তার দুই-এক ঘণ্টা পর পরবর্তী খাবার খাওয়া যেতে পারে। অনেকে রাতে ওষুধ খান, যাতে কোনো মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বিশ্রামে তা উপশম হয়। তবে রাতে খাওয়ার কোনো বিশেষ বাড়তি উপকারিতা নেই।

ওষুধ সেবনের পর কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যেমন বমি ভাব, বমি, পেটে হালকা ব্যথা, পাতলা পায়খানা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, তন্দ্রাভাব, মৃদু জ্বর বা পেশিতে হালকা ব্যথা। এসব সাধারণত গুরুতর নয়। তবে তীব্র পেটব্যথা, চোখ বা প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাওয়া, ত্বকে গোটা সৃষ্টি হওয়া—এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

ওষুধ খাওয়ার আগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা বিশেষ জরুরি। গর্ভাবস্থায় কৃমির ওষুধ খাওয়া নিষিদ্ধ। ওষুধ সেবনের আগে ও পরে (এক মাস পর্যন্ত) গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। এমনকি গর্ভধারণের সন্দেহ থাকলেও ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। কোনো কৃমির ওষুধে অ্যালার্জি থাকলে তা খাওয়া যাবে না। অন্য কোনো ওষুধ চলমান থাকলে বা কোনো রোগের উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্যও বিশেষজ্ঞের মতামত প্রয়োজন। সংক্রমণ আগে থেকেই থাকলে ভিন্ন ডোজ বা ভিন্ন ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।

সব শিশুকে কেন কৃমির ওষুধ দেওয়া হয়, তার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন চিকিৎসক। শৈশব-কৈশোরে স্বাস্থ্যবিধি সব সময় মেনে চলা সম্ভব হয় না। ঘাসের ওপর খেলাধুলা, মাটিতে হাঁটা—এসব থেকে কৃমি সংক্রমণ হতে পারে। পুষ্টির ঘাটতি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে তাই নিয়মমাফিক ওষুধ খাওয়ানোই উত্তম। বড়দের ক্ষেত্রে অবশ্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়, তবে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর ব্যক্তিদের প্রতিবছর প্রতিরোধমূলক ওষুধ সেবন করা উচিত।