চলতি গ্রীষ্মে তীব্র দাবদাহের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলীয় নদ-নলীর পানি মাছের জন্য প্রাণঘাতী মাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী কর্মকর্তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসব নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারি করেছেন। বিশেষ করে ট্রাউটের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনপ্রিয় প্রজাতির ওপর চাপ কমাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্বাভাবিকের চেয়ে কম শীত ও বিস্তৃত খরা পরিস্থিতির কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নদীগুলোর পানি দ্রুত গরম হয়ে পড়ছে।

ইয়েলোস্টোন জাতীয় উদ্যান বা পশ্চিম মন্টানার ব্ল্যাকফুট নদীতে ট্রাউট ধরতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অ্যাঙ্গলাররা ভ্রমণ করেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। শুক্রবার মন্টানার লিভিংস্টনের কাছে ইয়েলোস্টোন নদীর দ্রুতগামী পানিতে ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা মাইক ওয়েভার হাতে ফ্লাই ফিশিং রড নিয়ে নামেন। ৬২ বছর বয়সী ওয়েভার গা-ভেজানো বিশেষ পোশাকের বদলে হাফপ্যান্ট পরেই খালি হাত পানিতে ডুবিয়ে অনুভব করেন, "খুব একটা ঠাণ্ডা না।" প্রতিদিন বেলা ২টার পর ইয়েলোস্টোনের কিছু অংশে মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, "এই সম্পদ থাকা আমাদের জন্য দারুণ, কিন্তু এটা ব্যবস্থাপনাও করতে হবে।"

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তাপপ্রবাহের কারণে চাপে থাকা রেইনবো বা কাটথ্রোট ট্রাউট যদি ছবি তোলার জন্য খুব অল্প সময়ের জন্যও পানি থেকে তোলা হয়, তবুও সেটি তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কলোরাডোতে এই গ্রুহ্মকালে অভূতপূর্বভাবে মোট ৬৩৫.৫ মাইল (১০২৩ কিলোমিটার) দীর্ঘ ১৯টি নদীতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অপরদিকে, ইয়েলোস্টোন জাতীয় উদ্যান সম্প্রতি পুরো পার্কজুড়ে প্রতিদিন বিকেলের পর মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা করেছে। প্রতিবেশী মন্টানা রাজ্যেও বর্তমানে ১,২০০ মাইল (১,৯৩১ কিজ্ঞোমিটার) নদী এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।

মন্টানা ফিশ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড পার্কের মাৎস্য বিভাগের প্রশাসক, জীববিজ্ঞানী অ্যাডাম স্ট্রেনার জানিয়েছেন, "গত এক দশকেরও বেশী সময় ধরে এই বন্ধের ঘটনা খুবই সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কেউ কেউ বলতে পারেন জুনের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত এটি নিয়মিত ব্যাপার।" তার মতে, মানব-সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং খরা ঘন ঘন ও তীব্র হওয়ার সাথে এই প্রবণতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইয়েলোস্টোয়ে গত ছয় বছরের মধ্যে পাঁচ বছরই উচ্চ তাপমাত্রার কারণে মাছ ধরা নিষিদ্ধ হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি।

এর পরিণাম কেবল বাস্তুসংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রকি মাউন্টেন অঞ্চলের অনেক জনপদের অর্থনীতির সাথে ট্রাউট ফিশিং গভীরভাবে জড়িত। মন্টানার ইয়েলোস্টোন নদীর পাশে সুইটওয়াটার ফ্লাই শপ পরিচালনাকারী ড্যান গিগোন জানাচ্ছেন, অনেক দর্শনার্থী এখন গরম ও পানি কমে যাওয়ার সমস্যা এড়াতে তাদের ভ্রমণ সঙধ্যা পর্যন্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। তিনি মন্তব্য করেন, "লোকজন এখন বুঝতে পারছেন যে, এখানে আগস্ট মাস একটি অনিশ্চয়তার ব্যাপার, আদৌ মাছ ধরা যাবে কি না বা কেমন হবে। আমি এখানে ২২ বছর আছি এবং আমার স্মৃতিতে এই সময়টা সবচেয়ে উষ্ণ।"

উষ্ণ পানি কম অক্সিজেন ধারণ করে, যা মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস কঠিন করে এবং বৃদ্ধি ধীর করে দেয়। সংরক্ষণ গ্রুপ ট্রাউট আনলিমিটেড-এর কার্ক ডিটার জানান, সাধারণত শুষ্ক গুহ্মর ও নিম্ন পানের বছরে জলাধারগুলোর পানি নদীর স্তর ঠিক রাখতে সাহায্য করে, তবে এখন অনেক জলাধারই রেকর্ড পরিমাণ নিচু স্তরে পৌঁছেছে। তার বাসভূমি স্টিমবোট স্প্রিংসে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যভাগের গরম পানিতে ইয়াপা নদীর অসংখ্য মাছ মারা গিয়েছে, যাকে তিনি ট্রাউটের জন্য "একটি খারাপ পূর্বাভাস" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ২০১৬ সালে, কম ও গরম পানিতে ছড়িয়ে পড়া একটি পরজীবী থেকে হাজার হাজার মাছের মৃত্যুর পথরোধ করতে ইয়েলোস্টোন নদীর ১৮৩ মাইল অংশ সব ধরণের মাছ ধরা, রাফটিং ও অন্যান্য কার্যকলাপের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক লি লির সহ-লেখা একটি পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তুষারপ্রধান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল ও রকিজের মতো জায়গায় 'নদী তাপপ্রবাহ' ক্রমবর্ধমানভাবে ঘটছে। তিনি জানান, জরায়ু পরিবর্তন পাহাড়ি তুষারস্ফলের আকার ও সময়কে বদলে দিচ্ছে, যা নদীর এই তাপপ্রবাহের জন্য দায়ী। গবেষকরা আরও দেখেন, বুল ট্রাউটের মতো ঠান্ডা প্লানের মাছের ওপর চাপ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট উষ্ণ দিনের সংখ্যা বেড়েছে।

মন্টানার বিগফর্কের স্কুল অফ ট্রাউট-এর টড ট্যানার জানান, তার প্রতিষ্ঠান সাধারণত মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিমে ফ্লাই ফিশিংয়ের ক্লাস আয়োজন করলেও, গরম, শুষ্কতা ও দাবানলমাপন্ন পরিস্থিতি বাড়তে থাকায় সেই সুযোগ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। ৩৪ বছর ধরে পুরো সময় মন্টানায় বাস করা ৬৫ বছর বয়সী ট্যানার বলেন, "৩০ বা ২৫ বছর আগে আমরা এটা নিয়ে ভাবনাও করিনি।" তবে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে স্কুলটি এখন ক্লাসের সময়সূচি বদল করছে।