বর্তমান সামাজিক মাধ্যমে নিখুঁত শরীরের ছবি দেখে অনেকেই নিজের ও অন্যের চেহারা-গঠন নিয়ে সমালোচনায় মেতে ওঠেন। পেশীবহুল দেহ, স্লিম কোমর ও সঠিক অনুপাতের এই ছবিগুলো ধীরে ধীরে মানুষকে নিজের শরীরকে এক প্রকল্প হিসেবে ভাবতে শেখায়। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় বডি শেমিং—অন্যের শরীর নিয়ে উপহাস, ট্রলিং ও কটূক্তি। এটি নতুন কিছু নয়, কেবল মাধ্যম বদলেছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এই আচরণ অত্যন্ত গুরুতর পাপ।

ইসলাম শরীরচর্চার বিরোধী নয় বরং সুস্থ ও কর্মক্ষম শরীরকে আল্লাহর আমানত মনে করে। নবী করিম (সা.) নিজে তীর নিক্ষেপ, ঘোড়দৌড় ও কুস্তিতে সাহাবিদের উদ্বুদ্ধ করতেন। আরবের বিখ্যাত কুস্তিগির রুকানার সাথে তাঁর কুস্তির ঘটনা সিরাতগ্রন্থে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, ‘দুর্বল মুমিন অপেক্ষা শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়, তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম)। সুতরাং সুস্থ থাকার চেষ্টা ইসলাম নিরুৎসাহিত করে না।

সমস্যা দেখা দেয় যখন সুস্থতার উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়ে প্রদর্শনী ও অহংকারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। অনেক সময় জিম ও ডায়েট করা হয় ছবি তোলা ও অন্যদের সাথে তুলনার জন্য। এই যাত্রায় দেহ সুস্থ হলেও মানসিকতায় জন্ম নেয় এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধ। কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘তুমি অহংকারবশত মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও আত্মঅহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লোকমান, আয়াত ১৮)

ইতিহাসের এক ঘটনায় দেখা যায়, সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) গাছের ডাল ভাঙতে উঠলে তাঁর কাপড় সরে যায়। তাঁর চিকন পা দেখে কিছু সাহাবি হাসতে থাকেন। নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করেন কী দেখে হাসছেন? তারা পায়ের গঠন উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ—কেয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় এই দুটো পা ওহুদ পাহাড়ের চেয়েও ভারী হবে’ (মুসনাদে আহমাদ)। এই প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যায়, মানুষের শরীর নিয়ে হাসাহাসি কত মারাত্মক হতে পারে।

আরেকটি ঘটনায় আয়েশা (রা.) এক ব্যক্তির উচ্চতা নিয়ে মন্তব্য করলে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তুমি এমন কথা বললে, যা সমুদ্রের পানিতে মিশিয়ে দিলে তার রং ও স্বাদ বদলে যেত’ (সুনানে আবু দাউদ)। অর্থাৎ ছোট মন্তব্যও আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম গঠনে’ (সুরা তিন, আয়াত ৪)। প্রত্যেকের দেহ—লম্বা, খাটো, মোটা বা রোগা—আল্লাহর সৃষ্টি, তা নিয়ে উপহাস পরোক্ষে সৃষ্টির বিচার করার শামিল।

মর্যাদার মাপকাঠি নিয়ে নবীজি (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের দেহ ও বাহ্যিক আকৃতি দেখেন না; তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল’ (সহিহ মুসলিম)। তাই শরীর চর্চা ও ফিটনেস ভালো, কিন্তু আয়নার সামনে নিজেকে নিখুঁত ভেবে অন্যদের অপূর্ণ মনে করা ইসলামের সুস্থ সংস্কৃতি নয়। বরং অন্যদের প্রতি সম্মান ও নিজের আমলের প্রতি যত্নশীল হওয়াই প্রকৃত ইসলামি শিক্ষা।