ইসলামের ইতিহাসে সাহাবিদের ভূমিকা ও মর্যাদা অপরিসীম। তাঁদের ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে ইসলাম বর্তমান বিশ্বে দুইশত কোটিরও বেশি অনুসারী লাভ করেছে। মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আনুগত্যের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁদের বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। কোরআনের একাধিক আয়াতে সাহাবিদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি এবং তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। ফলে প্রতিটি মুমিনের জন্য সাহাবিদের আদর্শ অনুসরণ করা এবং তাঁদের প্রতি সুধারণা পোষণ করা ইমানি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত।
ইবনে হাজার আসকালানি ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে সাহাবির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, সাহাবি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নবীজির ওপর ইমান এনে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন। এই সংজ্ঞায় তিনটি শর্ত রয়েছে: নবীজির প্রতি ইমান, ইমানদার অবস্থায় তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ এবং ইসলামের ওপর মৃত্যু। কোরআনের সুরা তাওবার ১০০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ইমানে অগ্রগামী এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।
সাহাবিদের মধ্যে মর্যাদাগত স্তরভেদ থাকলেও পরবর্তী কোনো মুসলমান তাঁদের সমকক্ষ হতে পারেন না। হাদিসবেত্তা আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের একটি ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে কে উত্তম? জবাবে ইবনে মুবারক বলেন, নবীজির সঙ্গে জিহাদকালে সাহাবি মুয়াবিয়ার নাকে ধুলোবালি প্রবেশ করাও ওমর ইবনে আবদুল আজিজের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।
সাহাবিদের ফজিলত বর্ণনায় অসংখ্য কোরআনি আয়াত নাজিল হয়েছে। সুরা নিসার ৯৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা জীবন ও সম্পদ ব্যয় করে জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের মর্যাদায় শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। সুরা হাদিদের ১০ নম্বর আয়াতেও বিজয়ের আগে ও পরে ব্যয় করার মর্যাদার পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে, তবে সবাইকে উত্তম পরিণতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে বা আমার সাহাবিদের দেখেছে, জাহান্নামের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না। তিনি আরও বলেছেন, আমার উম্মতের সর্বোত্তম হলো আমার যুগের লোকেরা, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের লোকেরা।
সাহাবিদের সামান্য সমালোচনাও নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবিদের গালমন্দ করো না। কারণ, তোমাদের কেউ ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর পথে ব্যয় করলেও তাদের এক মুদ বা অর্ধমুদ যবের সওয়াবের সমান হবে না। তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন যে যারা সাহাবিদের অপছন্দ করে, তারা আসলে তাঁকেই অপছন্দ করে। এমনকি ‘সাহাবিদের মন্দ বলার ওপর আল্লাহর অভিশাপ’ বলেও হাদিসে উল্লেখ আছে।
ইমাম আবু আমর ইবনুস সালাহ, ইমাম আবু জুরআ, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল কঠোরভাবে সাহাবিদের সমালোচনার বিরোধিতা করেছেন। ইমাম আবু জুরআর মতে, যারা সাহাবিদের অবমাননা করে তারা ধর্মদ্রোহী, কারণ তারা কোরআন ও হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করতে চায়। ইমাম মালেক বলেছেন, তারা মূলত রাসুলের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে চেয়েছিল, কিন্তু তা না পারায় সাহাবিদের ব্যাপারে মিথ্যা রটিয়েছে। ইমাম তহাবি লিখেছেন, সাহাবিদের ভালোবাসা ইমান, আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ কুফরি।
তবে সাহাবিরাও মানুষ হিসেবে ভুল করতে পারতেন। ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, সাহাবিদের মধ্যে যুদ্ধ ও মতবিরোধের ঘটনায় আহলে সুন্নাহ নীরবতা অবলম্বন করে। তাঁদের দোষ-ত্রুটির বর্ণনা অনেকাংশে মিথ্যা বা বিকৃত; আর সত্য বর্ণনাগুলো তাঁরা মুজতাহিদ হওয়ায় ক্ষমার যোগ্য। সঠিক সিদ্ধান্তে দ্বিগুণ সওয়াব, আর ভুল হলেও এক সওয়াব পাওয়া যায়। তাঁদের অপরিসীম সৎকর্ম পরবর্তী কারও পক্ষে অর্জন সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
লেখক: মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, শিক্ষক, জামিয়া আল-ইহসান, ঢাকা।




