তাজমহলকে কেন্দ্র করে ভারতের আইনি অঙ্গনে নতুন এক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্ট গত ৬ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকার ও ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (এএসআই)-কে নোটিশ জারি করে জানতে চেয়েছেন, কেন বিশ্বখ্যাত এই সৌধটির নিচে মন্দিরের অস্তিত্ব অনুসন্ধানে জরিপ চালানো যাবে না। এই নির্দেশ আসে এক আবেদনের শুনানি চলাকালে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে তাজমহল আসলে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির, যার নাম ‘তেজো মহালয়া’।
আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের মতে, সৌধটি ভগবান শিবের (মহাদেব) উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত ছিল। মামলায় মূল পক্ষ হিসেবে মহাদেবকে রাখা হয়েছে, আর তাঁর ‘পরম বন্ধু’ হিসেবে আইনজীবী জৈন ও অন্যান্য ভক্তরা এই পিটিশন দায়ের করেছেন। জৈন ও তাঁর পুত্র বিষ্ণুশঙ্কর জৈন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। বিষ্ণুশঙ্কর জৈন আগে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে এমন বহু সৌধের তালিকা রয়েছে যেগুলোর নিচে হিন্দু পবিত্র স্থান থাকার অভিযোগ রয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী ধাপে ধাপে মামলা দায়েরের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
এখন এই মামলায় বাদীপক্ষ একটি ঘোষণামূলক ডিক্রি চেয়েছে, যাতে তাজমহলকে হিন্দু মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি, হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সৌধ প্রাঙ্গণে পূজা করার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে, যার অধীনে তাঁদের পূজা-অর্চনার অধিকার রয়েছে।
তবে এই আবেদনের পথ মসৃণ ছিল না। এর আগে ২০১৫ সালে একই দাবিতে আগ্রার একটি আদালতে আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু সেটি খারিজ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ২০১৯ সালে পুনরায় জরিপের জন্য অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের আবেদন করা হলেও আগ্রার দেওয়ানি আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে। আদালতের যুক্তি ছিল, বাদীপক্ষ সুনির্দিষ্ট জায়গার দাগ নম্বর বা রাজস্ব নথি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে আগ্রার জেলা জজ এই রিভিশন পিটিশনও খারিজ করে দেন। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয় বাদীপক্ষ।
আবেদনকারীদের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যসংক্রান্ত যুক্তি হলো, কথিত তেজো মহালয় মন্দিরটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব নির্মাণ করেন। পরে এটি রাজা মানসিংহ ও জয়পুরের রাজা জয়সিংহের মালিকানায় আসে। তাঁদের দাবি, মোগল সম্রাট শাহজাহান রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে এই প্রাসাদ জোরপূর্বক দখল করে নেন এবং মমতাজ মহলের সমাধিতে পরিণত করেন। এ সময় সৌধটির কিছু অংশ পরিবর্তন করে ইসলামিক বৈশিষ্ট্য সংযোজন করা হয় বলে অভিযোগ।
বাদীপক্ষ আরও দাবি করছে, অন্তত ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে এটি একটি হিন্দু মন্দির। সেসব প্রমাণের মধ্যে সৌধের শারীরিক গঠন, তালাবদ্ধ কক্ষ ও ভাস্কর্য উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অভিযোগ, এএসআই বেআইনিভাবে মুসলিমদের শুক্রবারে সেখানে নামাজ পড়ার অনুমতি দিচ্ছে, যা হিন্দুদের পূজার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে। সৌধের একাধিক তলা তালাবদ্ধ রাখা হচ্ছে বলেও অভিযোগ।
প্রসঙ্গত, এলাহাবাদ হাইকোর্ট এর আগেও বিতর্কিত রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের লখনৌ বেঞ্চ ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দেয়, যা পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পথ তৈরি করে। বর্তমান মামলাটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করছেন অনেকে।
ইতিহাসবিদদের মতে, তাজমহল ১৬৩১ থেকে ১৬৫৩ সালের মধ্যে শাহজাহানের নির্দেশে নির্মিত হয়। ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভারত সরকারের পর্যটন ওয়েবসাইটেও একই তথ্য উল্লেখিত। তবে হিন্দুত্ববাদী আইনজীবীরা এই ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের দাবি তুলে ধরেছেন।
আইনজীবী মহলের মতে, এই মামলা নতুন করে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূচনা করল। কয়েক বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও রামমন্দির নির্মাণের পথে যে আইনি প্রক্রিয়া ছিল, তার সঙ্গে এই মামলার সাদৃশ্য দেখছেন অনেকেই। তাজমহলের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা স্পষ্ট হবে আর কয়েক বছরের মধ্যেই।




