অনলাইন ব্যবসার একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে ড্রপশিপিং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই মডেলে বিক্রেতার নিজের কাছে কোনো পণ্য থাকে না; তিনি সরবরাহকারীর কাছ থেকে ক্রেতার ঠিকানায় পণ্য পাঠান, নিজে শুধু কমিশন নেন। পুঁজি ছাড়াই এই ব্যবসা চালানো যায় বলে তরুণ উদ্যোক্তারা এতে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে ইসলামি ফিকহের পুরনো নীতির সঙ্গে এই পদ্ধতির সংঘাত দেখা দিয়েছে।

সাহাবি হাকিম ইবনে হিজামের প্রশ্নের জবাবে নবী করিম (সা.) বলেছিলেন, 'যা তোমার কাছে নেই, তা বিক্রি কোরো না' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৩২)। অপর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, পণ্য নিজের নিয়ন্ত্রণে আসার আগে তা পুনরায় বিক্রি করা নিষিদ্ধ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৩৫)। ফিকহবিদদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হলো 'গারার' বা অনিশ্চয়তা। পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ এবং পণ্যের অস্তিত্ব নিয়ে ক্রেতার জন্য যে ঝুঁকি তৈরি হয়, তা ইসলামি ব্যবসায়িক নীতির পরিপন্থী।

ড্রপশিপিংয়ের প্রচলিত মডেলে এই সমস্যা বিদ্যমান। বিক্রেতা তার কাছে না থাকা পণ্য বিক্রি করেন, যা গারারের শামিল। তবে ফিকহবিদদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে আধুনিক বাণিজ্যিক কাঠামোর কারণে এটি সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না। কিন্তু অধিকাংশ সমসাময়িক ফিকহবিদ, বিশেষ করে ওআইসি ফিকহ একাডেমি, মনে করে প্রচলিত পদ্ধতিতে গারারের সমস্যা থেকে যায় এবং এটি সংশোধন করা প্রয়োজন।

ইসলামি অর্থনীতির আলেমরা এই ব্যবসাকে শরিয়তসম্মত করার দুটি পথ দেখিয়েছেন। প্রথমটি হলো ওকালত বা প্রতিনিধিত্বের মডেল। এতে ড্রপশিপার নিজেকে স্বাধীন বিক্রেতা নয়, বরং সরবরাহকারীর প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। ক্রেতাকে জানিয়ে দেন যে তিনি অর্ডার বুক করে দিচ্ছেন, বিনিময়ে কমিশন পাচ্ছেন। এই স্বচ্ছতা থাকলে প্রতারণার সম্ভাবনা থাকে না। ইমাম মারগিনানি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-হেদায়া'তে উল্লেখ করেছেন, প্রতিনিধি যদি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন এবং মূল মালিকের পক্ষে কাজ করেন, তাহলে চুক্তিটি বৈধ (আল-হেদায়া, ৩/২৬৭)।

দ্বিতীয় পথটি হলো বাইউস সালাম বা অগ্রিম চুক্তি। এ পদ্ধতিতে ক্রেতা আগে পুরো মূল্য পরিশোধ করেন এবং বিক্রেতা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পণ্য সরবরাহের দায়িত্ব নেন। ড্রপশিপিংয়ের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য যদি পণ্যের বিবরণ, গুণমান, পরিমাণ ও ডেলিভারির সময় পুরোপুরি স্পষ্টভাবে জানানো যায় এবং কোনো ত্রুটির দায়ভার বিক্রেতা নেন। কোরআনে সালাম চুক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, 'তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো' (সুরা বাকারা, ২৮২)। ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতে সালাম চুক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন (তাফসিরে ইবনে কাসির, ১/৭২৪)।

সুতরাং, ড্রপশিপিং নিজে কোনো অবৈধ ব্যবসা নয়। কিন্তু যে মডেলে ক্রেতা জানে না পণ্যটি কোথা থেকে আসছে, বিক্রেতার কোনো দায়িত্ব নেই এবং পণ্যের মানের নিশ্চয়তা নেই—সেই পদ্ধতি ইসলামের স্বচ্ছতার নীতি ভঙ্গ করে। কোরআনে বলা হয়েছে, 'আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন' (সুরা বাকারা, ২৭৫)। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী বৈধ ব্যবসার তিনটি শর্ত—পণ্যের অস্তিত্ব বা সুনির্দিষ্ট বিবরণ, নির্ধারিত মূল্য এবং অনিশ্চয়তার সর্বনিম্ন স্তর—এই মানদণ্ডে ড্রপশিপিংয়ের প্রচলিত রূপটি উত্তীর্ণ হয় না। তাই ওকালত বা সালামের মতো স্বচ্ছ পদ্ধতি গ্রহণ করে একে শরিয়তসম্মত করার পরামর্শ দিচ্ছেন ফিকহবিদরা।