গত শুক্রবার মন্ত্রিসভায় নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে এখন পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। এর আগে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৪ ও ২৩—অর্থাৎ মোট ৪৮ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার দপ্তর পরিবর্তন ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে বর্তমান কাঠামো গড়ে উঠেছে।

মন্ত্রিসভার বাইরে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রয়েছেন ১০ জন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তিনজন বিশেষ সহকারীও দায়িত্বে আছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধিও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করছেন। পাঁচটি মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা কাজ করছেন। অন্য দুটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও বিশেষ সহকারী রয়েছেন। তুলনামূলক কম কাজের পরিধির দপ্তরেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টার উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। আবার কোনো মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী থাকলেও উপদেষ্টা নেই, কোথাও মন্ত্রী একাই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন—এমন বৈচিত্র্যময় চিত্র নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভারসাম্যহীনতার প্রশ্ন উঠেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বেশি আলোচনায়। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে আছেন খলিলুর রহমান। এতদিন এই দপ্তরের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন হুমায়ুন কবির; গতকাল তাঁকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শামা ওবায়েদ ইসলামও এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। ফলে পররাষ্ট্রে এখন দুজন প্রতিমন্ত্রী—যা সাধারণত দেখা যায় না। উপদেষ্টা পদে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ায় এখন এই মন্ত্রণালয়ে আর কোনো উপদেষ্টা নেই।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থ মন্ত্রণালয় তিনি একাই দেখভাল করছেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি)। শুরুতে তিনি উভয় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন; গত মার্চে তাঁর দপ্তরের সংখ্যা কমানো হয়েছিল। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে আছেন জাহেদ উর রহমান, যিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি–বিষয়ক উপদেষ্টার কাজও করছেন। নতুন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আন্দালিব রহমান পার্থ; তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন ইয়াসের খান চৌধুরী।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং উপদেষ্টা মাহদী আমিন। মাহদী আমিন প্রবাসীকল্যাণ ছাড়াও শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরী আবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন। শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ—যিনি প্রথমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, পরে তাঁর দায়িত্ব কমানো হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু; প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। এই দপ্তরে কোনো উপদেষ্টা নেই, তবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্বে আছেন মো. সাইমুম পারভেজ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত; প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী হিসেবে আছেন এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী আবদুল মঈন খান; তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছেন সালাহউদ্দিন আহমদ—এই দপ্তরে প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা নেই। শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য—এই তিনটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রতিমন্ত্রী নেই। শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. রুহুল কবির রিজভী। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম।

সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ পরিবহন—এই তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম একাই। রেলপথ ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ; নৌ পরিবহন ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত; এখানেও উপদেষ্টা নেই।

সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন (এ জেড এম জাহিদ হোসেন); সমাজকল্যাণে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন। এই দুই দপ্তরে উপদেষ্টা নেই। ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এতদিন মন্ত্রী ছিলেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ); গতকাল গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার (লিংকন) এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন; এখানে কোনো উপদেষ্টা নেই।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু ও প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, যিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়েরও প্রতিমন্ত্রী। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এসেছে। এতদিন মন্ত্রী ছিলেন আফরোজা খানম; প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এখন আফরোজা খানমকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়েছে। হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন (পররাষ্ট্রে)। রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পদোন্নতি দিয়ে বিমান পরিবহন মন্ত্রী করা হয়েছে—ফলে তিনি এখন একাই এই মন্ত্রণালয় সামলাবেন।

কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ও প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন।

আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একাই পালন করছেন মো. আসাদুজ্জামান। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের; তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি—এই দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এই দপ্তর দুটিতে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন রেহান আসিফ আসাদ।

সব মিলিয়ে নতুন দপ্তর বণ্টনে একাধিক মন্ত্রণালয়ে একাধিক স্তরের দায়িত্বশীল এবং কোথাও একক দায়িত্বের মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারসাম্য ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।