শনিবার বিকেলে রাজধানীর রমনা এলাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ‘গণ-অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে?’—এই শিরোনামে আয়োজিত অনুষ্ঠানটির উদ্যোগ নেয় অ্যালায়েন্স ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস (এএমআরএ)। সেখানে প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের প্রসঙ্গটি ব্যাপকভাবে উঠে আসে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন দলীয়করণের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল দেশে আর কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে সেই চেতনার মূলে আঘাত করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, যদি দলীয়করণ পুনরায় ফিরে আসে, তাহলে হাজারো তরুণের আত্মত্যাগের প্রতি অবমাননা প্রদর্শন করা হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, যদিও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হওয়ার আশা করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান লক্ষণ ভালো দেখাচ্ছে না। তাঁর মতে, যেভাবে হানাহানি ছড়িয়ে পড়ছে ও দলীয় প্রভাব বিস্তার করছে, সেখান থেকে তৃণমূল পর্যায়ে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, রীতি অনুযায়ী বিরোধী দলকে ১০ থেকে ১২টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও এখন শোনা যাচ্ছে একটিও দেওয়া হবে না। এটি যদি জুলাই সনদের বাস্তবায়নের চিত্র হয়, তাহলে তা বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম তাঁর বক্তব্যে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে দলীয় প্রভাব কমানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশ এখন অনিরাপত্তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত জনঘনত্বের দেশে যদি পুলিশ ও প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট দলকে সেবা দিতে শুরু করে, তাহলে কোনো গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। তাঁর মতে, প্রশাসকসহ বিভিন্ন স্তরে দলীয় নিয়োগের এই প্রবণতা অন্তত ১০ শতাংশ কমানো প্রয়োজন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মো. আবদুল মান্নানও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা ভাবার বদলে সবার আগে বিএনপি—এই ধরনের একটি মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। তাঁর মতে, এই ধারার পরিবর্তন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, দ্য ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক কামাল আহমেদ একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করেন। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, দলীয় পরিচয় থাকা কোনো অপরাধ নয়, তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু বিএনপিকে নিয়ে নয়, দেশের সব মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমে দলের ভেতরের সংস্কৃতি বদলাতে হবে—এই যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, তা না হলে সরকারের আচরণেও পরিবর্তন আসবে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের যৌক্তিক সহযোগিতার সম্পর্ক থাকা উচিত। জাতীয় পার্টির মতো কৃত্রিম বিরোধী দল তৈরি হলে প্রকৃত গণতন্ত্র কার্যকর হবে না। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে তিনি বর্তমান সরকারকে সেই কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন আই খান তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসে। তাঁর মতে, যদি দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তি পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে সেই নিয়োগে কোনো সমস্যা নেই।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ সরকারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, দলীয় পরিচয় থাকা কোনো অন্যায় নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যক্তির আচরণ দলীয় হচ্ছে কি না। যোগ্যতা নির্ধারণের প্রশ্নে তিনি উল্লেখ করেন, কে যোগ্য ও কে অযোগ্য—সেটি নির্ণয়ের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, জনগণ যে গুণগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই পরিবর্তনের সূচনা করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক বক্তব্যের (রেটোরিক) চেয়ে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষকেই সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে। রাজনীতিতে জনতুষ্টিবাদ প্রয়োজন হলেও সরকারের দায়িত্বে থেকে তা করতে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। জামায়াতের নেতাদের উদ্দেশে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক একটি প্রশ্ন তোলেন—সরকারকে ব্যর্থ করে দেওয়ার পর কী হবে? তাঁর মতে, উত্তেজনার বশে আত্মঘাতী হয়ে পড়লে তা অন্য কোনো পক্ষের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির ফলে সৃষ্ট সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান বেসরকারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন (পুতুল) অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় নয়, দায়িত্বে রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সব যৌক্তিক আলোচনা ও বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এমন একটি সংসদ ও রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দল দেশের স্বার্থে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। তাঁর মতে, ভুলভ্রান্তি থাকলে যৌক্তিক সমালোচনা করা উচিত, কিন্তু অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও চরিত্রহনন কোনো গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অংশ হতে পারে না। আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোনো একক দল গড়ে তুলতে পারবে না—গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ধারণকারী প্রতিটি দলকে মিলেই এটি করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এএমআরএর আহ্বায়ক অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী। আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক, এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী ও নাজিফা জান্নাত, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা (মিলি), সাংবাদিক শাহেদ আলম ও এহসান মাহমুদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন (স্বাধীন)।




