মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সতর্কতা প্রত্যাহারের পর মেক্সিকোর মিকোয়াকান রাজ্যে অ্যাভোকাডো রপ্তানি কার্যক্রম আবার চালু হয়েছে। তবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও ঝুঁকি কিন্তু একেবারে কাটেনি। খেত থেকে শুরু করে প্যাকিং প্ল্যান্ট পর্যন্ত সব স্তরে কাজ শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মনে ভয় এখনো কাজ করছে।
মিকোয়াকানের সান্তা আনা জিরোস্তো এলাকার অ্যাভোকাডো সংগ্রহকারী ফ্রান্সিসকো ইসিদ্রো সতর্কতা প্রত্যাহারের পরের দিনই আবার গাছে ওঠেন। প্রায় ছয় মিটার উঁচু গাছে উঠে পনেরো মিনিটের মধ্যে তিনি একটি বাক্স অ্যাভোকাডো ভর্তি করে ফেলেন। কয়েকদিন কাজ না থাকার পর বেতন পেয়ে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন। আট দিনের এই বিরতির সময় মেক্সিকোর সেনাবাহিনী মিকোয়াকান অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
মেক্সিকোর প্রধান অ্যাভোকাডো উৎপাদনকারী অঞ্চল মিকোয়াকানে ট্রাম্প প্রশাসনের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত চারটি কার্টেল সক্রিয়। সপ্তাহান্তে খেতগুলো আবার চালু হয়েছে, প্যাকিং প্ল্যান্টগুলো পূর্ণ গতিতে কাজ করছে এবং মার্কিন কৃষি বিভাগের পরিদর্শকরা ফল পরীক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর আগে পোকামাকড়মুক্ত নিশ্চিত করছেন। শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি ফিরে পাওয়ায় খুশি হলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন এই শান্তি বেশি দিন টিকবে না।
দীর্ঘদিনের অ্যাভোকাডো ব্যবসায়ী ভ্যালেন্তিন রদ্রিগেজ বলেন, কিছুদিন নিরাপদ থাকা যাবে, এরপর কী হয় দেখা যাবে। এই সহিংস রাজ্যে অনেক ধরনের হুমকি সম্ভব। মার্কিন সতর্কতার সময় ইসিদ্রো গাছে উঠে কাজ করছিলেন। ফোরম্যানের চিৎকারে কাজ বন্ধ করতে বলা হলে তিনি বুঝতে পারেন পরিস্থিতি খারাপ। দৈনিক মজুরিতে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য এর অর্থ হলো নতুন কাজ খোঁজা অথবা স্ত্রীর ছোট দোকানের আয়ে সংসার চালানো।
টাকাম্বারো শহরের একটি প্যাকিং প্ল্যান্টের প্রকৌশলী ভোররাতে সতর্কবার্তা পান যে প্ল্যান্টটি সিল করে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। মিকোয়াকানের অ্যাভোকাডো শিল্পে কর্মরত প্রায় ২০০ হাজার মানুষ এই পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তায় পড়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ সতর্কতার কারণ জানায়নি, তবে এই রাজ্যে একাধিক কার্টেল মাদক পাচার ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। অনেক চাষি চাঁদাবাজিকে উৎপাদন খরচের অংশ হিসেবে মানতে শুরু করেছেন। সম্প্রতি এক চাষি জানান, তিনি প্রতি কেজি রপ্তানিতে ১ পেসো চাঁদা দেন এবং দৈনিক প্রায় ৯০ টন রপ্তানি করেন, যা দৈনিক ৫ হাজার ডলারের বেশি।
মার্চ মাসে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টন অ্যাভোকাডো পাঠানো হয়েছে। পশ্চিম মিকোয়াকানের সড়কে অ্যাভোকাডোবোঝাই ট্রাক ডাকাতির শিকার হওয়ার ঘটনাও আছে। জালিস্কো সীমান্তের কাছে কিছু কৃষককে সশস্ত্র লোকেরা আটকে মারধর করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে মার্কিন পরিদর্শকদের ওপর হামলা ও আটকের ঘটনায় রপ্তানি বন্ধ হয়েছিল। কিছু পরিদর্শক পোকামাকড় শনাক্ত করে রিপোর্ট না করার চাপে ছিলেন বলে জানা গেছে।
এখন পরিদর্শকরা খেতের চেয়ে প্যাকিং প্ল্যান্টগুলোতে বেশি সময় দেন। রদ্রিগেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিরাপত্তার কারণে প্রযুক্তিগত সেবা স্থগিত করে, তাহলে রপ্তানি অসম্ভব। রোগের কারণে হলেও একই অবস্থা। আমরা পুরোপুরি মার্কিন বাজার ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯১৪ সালে অ্যাভোকাডো পোকা পাওয়া যাওয়ার পর আট দশক ধরে মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাভোকাডো পাঠাতে পারেনি। ১৯৯৭ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় যখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদা মেটাতে পারেনি।
মেক্সিকোর ৮০ শতাংশের বেশি অ্যাভোকাডো যুক্তরাষ্ট্রে যায়। বছরের শুরুতে সুপার বোলের আগে গুয়াকামোলের চাহিদা বাড়ায় বিপুল পরিমাণ অ্যাভোকাডো রপ্তানি হয়। এই প্রবাহ বজায় রাখতে সার্টিফিকেশন জরুরি। ইসিদ্রো একজন সার্টিফাইড সংগ্রহকারী। তিনি জানেন কীভাবে কাটার সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করতে হয় এবং ফল দ্রুত ও সাবধানে হ্যান্ডেল করতে হয়। তার কাজের খেতগুলোও সার্টিফাইড, যেখানে শ্রমিকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা আছে। সুপারভাইজার জেসুস মেন্দেজ লোড করার আগে বাক্স পরীক্ষা করেন। ট্রাকগুলো কনভয়ে করে পুলিশ পাহারায় প্যাকিং প্ল্যান্টে যায়। সেখানে মান, ফলের শাঁস ও পোকামাকড় পরীক্ষা করা হয়। আকার অনুযায়ী সাজানোর পর শ্রমিকরা বাক্সে ভরে সিল করে সীমান্তে পাঠান। সামান্য নিরাপত্তা সতর্কতায় পুরো প্রক্রিয়া থেমে যেতে পারে।
মিকোয়াকানে দেড় হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন ও চাঁদাবাজি সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার কিছুটা স্বস্তি দিলেও ভয় পুরোপুরি কাটেনি। পশ্চিম মিকোয়াকানের চাষি লুইস ম্যানুয়েল সোতো আশা করছিলেন নিরাপত্তা বাড়বে, কিন্তু এখনো তা অনুভব করেননি। ২০২৪ সালে সশস্ত্র লোকেরা তাকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে হত্যার হুমকি দেয় এবং চাঁদা দাবি করে। গত জুলাইয়ে আবার হুমকি আসে, যদিও আগের ঘটনায় একজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। তাকে ফোনে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি এখন মাঝে মাঝে খেতে যান, ব্যবসা দূর থেকে পরিচালনা করেন এবং প্রসিকিউটরের কাছে সুরক্ষা চেয়ে যান। সান্তা আনা জিরোস্তো এলাকার বাসিন্দারা সেনা মোতায়েনকে স্বাগত জানিয়েছেন। মেন্দেজ বলেন, এটি কিছুটা শান্তি দেয়, তবে কিছু গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষ হতে পারে বলে ভয়ও লাগে।




