বস্ত্রশিল্পের বিশাল উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবেশ দূষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বিপুল অঙ্কের নতুন যন্ত্রপাতি ছাড়াই, কেবল উৎপাদন পদ্ধতি পরিবর্তন করে কার্বন নির্গমন ও পানির অপচয় কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন শায়ক। পরিবেশবান্ধব এই গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন তিনি।

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষণকারী শিল্প হিসেবে পরিচিত পোশাকশিল্প। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের প্রায় আট শতাংশের জন্য দায়ী এই খাত। প্রচলিত ধারায় দূষণ কমাতে নতুন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিকীকরণের মতো বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যা বেশিরভাগ কারখানার পক্ষে সহজসাধ্য নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ড. আব্বাস গড়ে তুলেছেন ‘ডিকার্বনাইজেশন ল্যাব’।

ডিকার্বনাইজেশন ল্যাবের ধারণা ও কার্যপদ্ধতি:
ডিকার্বনাইজেশন হলো প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রক্রিয়া। ড. আব্বাসের মতে, এই প্রক্রিয়ার চারটি প্রধান পথ রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ও উৎপাদনব্যবস্থার বৈদ্যুতিকীকরণে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু চতুর্থ পথটি ভিন্ন—উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবন (প্রসেস ইনোভেশন)। তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য বিদ্যমান প্রযুক্তি ব্যবহার করেই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তোলা, কম পানি, কম তাপ ও কম রাসায়নিক ব্যবহার করে একই মানের উৎপাদন নিশ্চিত করা।

উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবনের ফলাফল:
গবেষণায় দেখা গেছে, নিট কাপড়ের ডাইংয়ে বায়ো স্কাওরিং ও বায়োপলিশিং—এই দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে সম্পন্ন করলে পানির ব্যবহার প্রায় ৪০ শতাংশ ও বিদ্যুতের ব্যবহার ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। গার্মেন্টস ওয়াশিংয়ে পানির অনুপাত ও রিনসিং ধাপ কমিয়ে পানির ব্যবহার ৩৫ শতাংশ ও বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় ১৮ শতাংশ কমানো সম্ভব। ইয়ার্ন ডাইংয়ে প্রিট্রিটমেন্ট ধাপ পুনর্বিন্যাস করে পানির ব্যবহার ৭৫ শতাংশ ও বিদ্যুতের ব্যবহার ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সাফল্য পাওয়া গেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল এসেছে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বাষ্প পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে। সাধারণত বাষ্প ঠান্ডা হয়ে তৈরি গরম পানি অপচয় করা হলেও তা পুনর্ব্যবহার করলে পানির সাশ্রয় ১০০ শতাংশ ও বিদ্যুতের সাশ্রয় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত সম্ভব। এছাড়া বর্জ্য পানি শোধনাগার (ইটিপি) থেকে পরিশোধিত পানি পুনর্ব্যবহার করে পানির ব্যবহার ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা দেখিয়েছে গবেষণাটি।

বাংলাদেশের জন্য গুরুত্ব:
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। অর্থনীতির বড় অংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়, বরং উৎপাদনের সময় কত কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, কত পানি ব্যবহৃত হয়েছে—এসব তথ্যও জানতে চায়। ২০৩০, ২০৩৫ ও ২০৫০ সালের জন্য বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড নিজস্ব জলবায়ু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ফলে আগামী দিনে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে। ড. আব্বাসের মতে, বিশ্বের পোশাকশিল্পে মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৫২ শতাংশ আসে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের ধাপ থেকে। প্রচলিত প্রযুক্তিতে এর কিছু অংশ কমানো গেলেও নেট-জিরো লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও উদ্ভাবন প্রয়োজন।

ডিকার্বনাইজেশন ল্যাবের যাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করলেও এর পেছনের গবেষণা অনেক পুরোনো। ড. আব্বাস ২০১০ সাল থেকে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেন এবং ২০১৫-১৬ সালের দিকে উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবর্তন ও সদ্ব্যবহারের কাজ শুরু করেন। ২০২২-২৩ সালে একটি জার্মান উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্পের আওতায় তিনি প্রায় ৫০টি কারখানার সঙ্গে কাজ করেন। বর্তমানে কয়েকটি কারখানায় সরাসরি কাজ চলছে, তবে সামগ্রিকভাবে তাঁর দল ২০০টির বেশি কোম্পানির সঙ্গে ডিকার্বনাইজেশন ও প্রক্রিয়া উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করেছে। দলটিতে পাঁচজন সদস্য রয়েছেন। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সহযোগিতায় একাধিক কারখানায় নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি একটি ডিজিটাল ডিকার্বনাইজেশন ডায়াগনস্টিক টুল তৈরির কাজও চলছে, যা দূর থেকেই কারখানার শক্তির অপচয়ের জায়গা শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।

গবেষকের পটভূমি:
ড. আব্বাসের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে। পরে বুটেক্স থেকে ২০০২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর প্রায় তিন বছর পোশাকশিল্পে কাজ করেন। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় স্নাতকোত্তর, ২০০৯ সালে আইবিএ থেকে এমবিএ এবং পরে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০১৭ সালে বুটেক্সে শিক্ষকতায় যোগ দেন। বর্তমানে তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র প্রসেস অপটিমাইজেশন, সার্কুলার ইকোনমি ও টেক্সটাইল রসায়ন। গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া এ উদ্যোগ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ড. আব্বাসের মতে, সরকার, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, খুচরা বিক্রেতা, গবেষক, উন্নয়ন সংস্থা ও কারখানা—সব পক্ষের অংশীদারত্ব ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর গবেষণা প্রমাণ করছে, কার্বনমুক্ত ভবিষ্যতের পথ সব সময় বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব দিয়ে শুরু হয় না, কখনো কখনো শুরু হয় কাপড় রং করার একটি প্রক্রিয়া বদলে দেওয়ার মাধ্যমেই।