বিশ্বের প্রাচীনতম বোতল-বার্তার মুকুট এখন অস্ট্রেলিয়ার একটি সৈকত থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটের মাথায়। ১৩২ বছরের পুরোনো এই বার্তাটি ২০১৮ সালে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ওয়েজ আইল্যান্ডের উত্তরের বালুকাময় তীরে খুঁজে পেয়েছিলেন টনিয়া ইলম্যান নামের এক নারী। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, অদ্ভুত সুন্দর বোতলটি ঘরের বইয়ের তাক সাজানোর জন্য নিখুঁত হবে। কিন্তু ঘরে ফিরে পরিবারের একজন সদস্য যখন ভেতরের বালি বের করতে গিয়ে শক্ত করে পাকানো একটি ছোট কাগজ বের করেন, তখনই উন্মোচিত হয় ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
কাগজটি ছিল ভেজা ও স্যাঁতস্যেঁতে। যত্ন সহকারে শুকানোর পর দেখা যায়, এটি একটি ছাপা ফর্ম, যাতে অস্পষ্ট হাতে জার্মান ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। চিরকুটটি সুতা দিয়ে বাঁধা ছিল। অনলাইনে খোঁজাখুঁজি শুরু করলে টনিয়া ও তাঁর স্বামী জানতে পারেন, বোতলটি জার্মানির একটি নৌ মানমন্দিরের বিশাল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার অংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের স্রোত কীভাবে প্রবাহিত হয় এবং কোন দিকে যায়, তা বোঝার জন্য গবেষকরা টানা ৬৯ বছর ধরে অসংখ্য বোতল সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।
ফর্মের গায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল—বোতলটি ঠিক কবে সাগরে ফেলা হয়েছে, জাহাজের নাম কী, কোন পথে জাহাজটি অগ্রসর হচ্ছিল এবং স্থানাঙ্ক কত ছিল। উল্টো পিঠে নির্দেশ ছিল, যে ব্যক্তি এটি পাবেন, তিনি যেন বোতল পাওয়ার তারিখ ও স্থান লিখে জার্মান মানমন্দিরে ফেরত পাঠান। চিরকুটের তথ্য অনুসারে, ১৮৮৬ সালের ১২ জুন ‘পাউলা’ নামের একটি জাহাজ কার্ডিফ (ওয়েলস) থেকে ইন্দোনেশিয়ার মাকাসার শহরের দিকে যাত্রা করার সময় কেউ এটি সাগরে ছুড়ে মারে।
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম ও জার্মানির বিশেষজ্ঞরা কাগজ ও হাতের লেখা পরীক্ষা করে পুরোপুরি নিশ্চিত হন, এটি আসল। মিউজিয়ামের সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্বের সহকারী কিউরেটর রস অ্যান্ডারসন জানান, জার্মানির আর্কাইভে ঘেঁটে ‘পাউলা’ জাহাজের ক্যাপ্টেনের মূল লগবুক সত্যিই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সেখানে ১৮৮৬ সালের ১২ জুনের পাতায় ক্যাপ্টেনের নিজের হাতে লেখা রয়েছে—ওই দিন নির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক থেকেই একটি বোতল সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চিরকুটের লেখার সঙ্গে লগবুকের এন্ট্রি হুবহু মিলে যাওয়ায় সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকেনি।
এই আবিষ্কারের মাধ্যমে বোতলটি ১৩২ বছরের পুরোনো হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বোতল-বার্তার রেকর্ড স্থাপন করে। একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, যখন এই বোতলটি সাগরের ঢেউয়ে ভাসছিল, তখন পৃথিবীতে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটেনি, টাইটানিক ডুবে যায়নি, এমনকি রাইট ভাইরাও উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেননি। সময়ের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় একটি ছোট কাগজের টুকরো কীভাবে টিকে রইল, তা নিজেই একটি বিস্ময়।
অথচ এই রেকর্ডের সিংহাসন এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ২০২২ সালে স্কটল্যান্ডের একটি বাড়ির মেঝের তক্তা তুলতেই এক প্লাম্বার একটি বোতল খুঁজে পান, যার বয়স ১৩৫ বছর হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির একটি সৈকতেও হালকা নীল রঙের আরেকটি বোতল পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত আরও পুরোনো। কিন্তু স্কটল্যান্ড ও নিউ জার্সির দুটি বোতলের বয়স এখনো বিজ্ঞানীরা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি। তাই যাচাই-বাছাই সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সৈকতে পাওয়া ১৩২ বছরের ওই চিরকুটই চ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রেখেছে।
কে জানে, হয়তো বাংলাদেশের কক্সবাজার বা কুয়াকাটার সৈকতে হাঁটতে গিয়েও কেউ এমন কোনো বোতল কুড়িয়ে পেতে পারেন—যা কোনো অজানা নাবিকের গল্প বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছে। সূত্র: আইএফএল সায়েন্স




