কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনের বিভিন্ন কক্ষ ও অব্যবহৃত অপারেশন থিয়েটারে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে প্রায় ২১ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম। কোনোটি এখনো বাক্সবন্দী অবস্থায়, কোনোটি অযত্নে রাখা—কতটি সচল, আর কতটি নষ্ট হয়ে গেছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই যন্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ সফটওয়্যার-নির্ভর। কেনাকাটার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কিছুদিন কয়েকটি যন্ত্র চালু করে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু পুরো বিল পরিশোধ না হওয়ায় হঠাৎ সব যন্ত্রে পাসওয়ার্ড চাওয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বকেয়া বিলের কথা বলে তারা আর সহযোগিতা করেননি। ফলে যন্ত্রগুলো ‘লক’ হয়ে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। তৎকালীন সরকারের আমলে ‘স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি’র আওতায় হাসপাতালটির জন্য ৩২ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার সরঞ্জাম কেনা হয়। রাজশাহীর মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স ১১৮ ধরনের এবং হারামান এন্টারপ্রাইজ ৭৫ ধরনের যন্ত্র ও চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ করে। দুই ঠিকাদারকে ১১ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি ২০ কোটি ৯৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা এখনো পরিশোধ হয়নি।

পড়ে থাকা সরঞ্জামগুলোর তালিকায় রয়েছে ইটিটি (এক্সারসাইজ টলারেন্স টেস্ট) মেশিন, ইকোকার্ডিওগ্রাফি (হৃদ্‌যন্ত্রের আলট্রাসাউন্ড) যন্ত্র, পোর্টেবল এক্স-রে, এন্ডোস্কোপি মেশিন, ইলেকট্রোসার্জিক্যাল ইউনিট (ডায়াথার্মি মেশিন), অপারেশন থিয়েটারের লাইট, ইনফিউশন পাম্প, সিরিঞ্জ পাম্প, ডিফিব্রিলেটর, পালস অক্সিমিটার, অর্থোপেডিক সেট, আর্থ্রোস্কোপ এবং ডপলার হার্ট ডিটেক্টর। এগুলো রোগনির্ণয় ও বিভিন্ন চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত হয়।

সরঞ্জামের পাশাপাশি জনবল সংকটেও সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ২০১৭ সালে ১০০ শয্যার এই হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও কর্মচারী কাঠামো সে অনুপাতে বাড়েনি। ৩৭১ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ২০ জন। ৩৪০ নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ১৬০ জন।

ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে গরিব মানুষ বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ২ আগস্ট সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী এলাকার কৃষক আসগর আলী বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে এলে চিকিৎসক তাকে বাইরে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে যে পরীক্ষা ২০০ টাকায় সম্ভব, বেসরকারি ক্লিনিকে সেটির খরচ প্রায় ১০০০ টাকা।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক নূরে নেওয়াজ জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিল না পাওয়ায় সরঞ্জামগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে না। তাঁর মতে, আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গাফিলতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ১২ জুন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক মো. শহিদুল্লাহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ জানান। সেখানে বলা হয়, ২০১৮-১৯ সালের বরাদ্দ থেকে আংশিক বিল পরিশোধ করা হয়। পরবর্তী প্রতিটি অর্থবছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট’ বরাবর বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি। ওই চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ কমিটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যন্ত্রগুলো পর্যবেক্ষণ করেছিল এবং তখন পর্যন্ত সেগুলো সচল ছিল।

হাসপাতালের ইকোকার্ডিওগ্রাফি মেশিনের টেকনিশিয়ান মো. খাইরুল বারিয়া বলেন, কেনাকাটার পর শুরুর দিকে কিছুদিন কয়েকটি যন্ত্র চালু করা হয়েছিল। পরে হঠাৎ পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বকেয়া বিলের কথা উল্লেখ করে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়।

বিষয়টি জানতে পেরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত বছরের শেষ দিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ওয়াজেদ আলী ৭ আগস্ট জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—ঠিকাদার পাওনা না পেয়ে যন্ত্রগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়নি। অন্যদিকে, যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক মো. মিলন মিয়া বলেন, চুক্তি অনুযায়ী পুরো বিল দেওয়া হয়নি। বর্তমানে যন্ত্রগুলোর অবস্থা সম্পর্কে তাঁদের জানা নেই।

কুড়িগ্রাম জেলার ২০ লাখের বেশি মানুষের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র এই জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী এখানে সেবা নিতে আসেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুড়িগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি মো. খাইরুল আনম বলেন, সরকারি অর্থে কেনা আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়, এটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, যন্ত্রগুলো দ্রুত চালু করতে সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ প্রয়োজন।