চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে গত ১৪ আগস্ট একটি জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে প্রথমে নয়জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার আরও একজনের মৃত্যু হলে এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় দশে। ওই দিন কারখানায় উপস্থিত ছিলেন ৩২ বছর বয়সী দীপু দাশ, যিনি সেখানে কাটারম্যানের সহকারী হিসেবে কর্মরত। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।
ঘটনার দিন সকাল সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে দীপু ও তাঁর দল জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করেন। তাঁদের দলে ছিলেন চারজন কাটারম্যান ও তিনজন হেলপার। বাইরে ফোরম্যান ও সেফটি অফিসারসহ আরও পাঁচজন উপস্থিত ছিলেন। দীপু ও তাঁর ওস্তাদ পলাশ দাশ কাজ করছিলেন ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দশ ফুট উচ্চতায়। অন্যদিকে নাসির ও তাঁর ভাই মনসুর ফোরম্যান ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি ছাড়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ট্যাংকটির পানি বের করার জন্য আগে কেউ একটি ছিদ্র তৈরি করে রেখেছিলেন। পুরোপুরি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে ছিদ্রের মুখ খুলতেই নাসির হঠাৎ দাঁড়ানো অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁর পাশে থাকা ভাই মনসুর তাঁকে উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলে তিনিও একইভাবে অচেতন হয়ে পড়েন।
এই দৃশ্য দেখে অন্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যে-ই উদ্ধার করতে ছুটে গেছেন, তিনিই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে গেছেন। দীপুর ওস্তাদ পলাশ প্রতিবেশী সানি দাশকে পড়ে যেতে দেখে দ্রুত নিচে নেমে তাঁর পোশাক ধরে টেনে তুলতে যান। পেছনে দীপুও দৌড়ে যান। কিন্তু পলাশ সানির পোশাক টানার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও পড়ে যান। এ সময় দীপুর নাকে বিদঘুটে গন্ধ লাগে, মাথা ঝিম ধরে আসে এবং তিনি সামনে না গিয়ে উপরের দিকে উঠে উচ্চকণ্ঠে জানান যে ঘটনাস্থলে বহু শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং সবার দ্রুত সেখানে পৌঁছানো জরুরি। তাঁর চিৎকার শুনে চারপাশ থেকে শ্রমিকরা ছুটে আসেন। পাশের জাহাজ থেকেও লোকজন ভেতরে ঢুকে পড়েন। দীপু ঘটনাস্থল দেখানোর জন্য আবার ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর মাথা ঘুরে পড়ে যান। পরে আশপাশের লোকজন তাঁকে এ কে খান এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।
ওই দিন বেলা দুইটার দিকে দীপুর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। তখনই তিনি জানতে পারেন যে তাঁর প্রতিবেশী নাসির, মনসুর, সানি এবং ওস্তাদ পলাশ—সবাই মারা গেছেন। এই খবর শুনে তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে নগরের অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। গত সোমবার সেখান থেকে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও তিনি এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেননি। তাঁর চোখের সামনে এখনো সহকর্মীদের মৃত্যুর দৃশ্য ভাসে এবং সেদিনের কথা মনে করলে তিনি প্রায়ই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দুর্ঘটনার পর থেকে দীপু আর কাজে ফিরতে পারেননি। ঘণ্টায় ষাট টাকা মজুরিতে তিনি কাজ করতেন; মাসের পাঁচ ও বিশ তারিখে বেতন দেওয়া হতো। কারখানা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের খরচ বহন করলেও এর বাইরে কোনো ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তা তিনি পাননি। এমনকি তাঁর বকেয়া বেতনও পরিশোধ করা হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শে ডাবসহ বিভিন্ন পথ্য খাওয়ার কথা থাকলেও টাকার অভাবে তিনি সেগুলো কিনতে পারছেন না। তাঁর বাড়ি কারখানা থেকে মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরে। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বছর হিসেবে ভাড়া নিয়ে তিনি সেখানে দুই কক্ষের একটি টিনশেড ঘরে বসবাস করেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী পূর্ণিমা দাশ, দেড় বছরের ছেলে ঋষি এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় ছেলে অভিজিৎকে নিয়ে সংসার।
দীপু দাশের স্ত্রী পূর্ণিমা জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষের পেশা ছিল মাছ ধরা। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ওই পেশা ছেড়ে দীপু প্রথমে সেলুনে কাজ শেখেন। কয়েক বছর সেলুনের দোকান চালিয়ে সংসার চালালেও পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় ছয় বছর আগে তিনি সেই দোকানও বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি ফেরদৌস স্টিলে কাটারম্যানের সহকারী হিসেবে যোগ দেন। পূর্ণিমা আরও বলেন, দুর্ঘটনার পর চার দিন হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে হাতে থাকা সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পর কোনো রকমে সংসার চলছিল। মালিকপক্ষের কেউ তাঁদের দেখতে আসেননি এবং কোনো সাহায্যও করেননি। গতকাল এক আত্মীয় কিছু খাবার কিনে দিয়েছেন।
কারখানার কাটারম্যান সুলতান আহাম্মদ গত বৃহস্পতিবার দীপুকে দেখতে তাঁর বাড়িতে আসেন। তিনি জানান, যে ট্যাংকটি কাটা হচ্ছিল, সেটি ছিল দুই নম্বর ট্যাংক। এর আগে এক নম্বর ট্যাংকের দুই-তৃতীয়াংশ কাটা শেষ হয়েছিল। এক মাস আগে ওই ট্যাংক কাটার সময়ও গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে সুলতানসহ তিন শ্রমিক অসুস্থ হয়েছিলেন। তিনি আরও জানান, শুক্রবার হওয়ায় সেদিন তিনি কাজে যাননি; অন্যথায় ওই ট্যাংকটি কাটার দায়িত্ব তাঁরই ছিল।
এদিকে দুর্ঘটনার পর তিন দিন পেরিয়েও তদন্তকারী দল জাহাজের কাছে যেতে পারেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, আগামীকাল রোববার হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।




