খুলনার কয়রা উপজেলার সিংহেরটেক এলাকার সন্নিকটে শাকবাড়িয়া ও আড়পাঙ্গাশিয়া নদীর মিলনস্থলে একটি কাঠের ইঞ্জিনচালিত পর্যটকবাহী নৌকা গতকাল বিকেলে আকস্মিকভাবে ডুবে যায়। নৌকায় থাকা নয়জন যাত্রীই পানিতে পড়ে গেলেও নৌ পুলিশের দ্রুত ও দক্ষ অভিযানের ফলে তাঁদের সবাইকে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সংঘটিত এই দুর্ঘটনায় কোনো প্রাণহানি কিংবা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ।
উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা করতে গিয়ে আংটিহারা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক হোসেন জানান, ঘটনার সময় তাঁদের একটি টহল দল নদীতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিল। হঠাৎ ৯৯৯ জরুরি সেবার মাধ্যমে খবর আসে যে, সিংহেরটেক এলাকায় পর্যটকসহ একটি নৌকা ডুবে গেছে। বার্তা পাওয়ামাত্রই সদস্যরা ঘটনাস্থলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হন। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, উল্টে যাওয়া নৌকাটি ধরে তিনজন নদীর মাঝখানে ভাসছিলেন। অপর ছয়জন নদীর তীরের দিকে সাঁতরে গিয়ে সুন্দরবনের দিকে উঠে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের সবাইকে উদ্ধার করেন। ফারুক হোসেন আরও ব্যাখ্যা করেন, নৌকাটি সুন্দরবনের তীরবর্তী এলাকায় ডুবে গিয়েছিল; স্থানটির একপাশে লোকালয় এবং অন্যপাশে ঘন বন থাকায় কয়েকজন সাঁতরে বনের দিকে উঠে যান। দ্রুত তৎপরতার কারণেই কোনো বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
উদ্ধারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন নৌকার মাঝি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নাপিতখালী এলাকার কিসমত আলী (৪৮), নাঈম হোসেন (২২), রাকিবুল হাসান (১৮), মো. আশিক (২৫), মো. পলাশ হোসেন (২৩), মো. শাহীন (২৫), ইমামুল হোসেন (২৫), যশোরের বেনাপোল পৌরসভার কাগজপুকুর এলাকার মো. গালিব (২৫) এবং মো. আবদুল্যাহ (২২)। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে শ্যামনগরের নাপিতখালী এলাকা থেকে কয়রার আংটিহারা ও সুন্দরবনের আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে তাঁরা নৌকায় রওনা হন। ঘোরাঘুরি শেষ করে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে সিংহেরটেক এলাকায় নদীর মধ্যভাগে পৌঁছালে হঠাৎ নৌকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। একপর্যায়ে নৌকাটি ডুবে গেলে তাঁরা সবাই নদীতে পড়ে যান।
দুর্ঘটনাস্থলের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কাশিয়াবাদ বন বিভাগের স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন জানান, নৌকাডুবির স্থানটি শাকবাড়িয়া ও আড়পাঙ্গাশিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত। ব্রিটিশ শাসনামলের মানচিত্রে ওই স্থানটি ‘রাই নদী’ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। নদটি লোকালয়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সেখানে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে। বর্তমানে সুন্দরবনে বন্য প্রাণীর প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে বনজীবী ও পর্যটকদের বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তবে লোকালয়ের সংলগ্ন নদীপথে যাতায়াতে কোনো বাধা নেই। ওই নৌকাও মূলত লোকালয়ের পাশের নদীপথ দিয়েই চলাচল করছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। দুর্ঘটনাস্থলটি কাশিয়াবাদ বন বিভাগের আওতাধীন আন্দারমানিক টহল ফাঁড়ির সীমানার মধ্যে পড়ে।
সবমিলিয়ে, নৌ পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ প্রচেষ্টায় নয়জন যাত্রীই অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নদীপথে চলাচলের সময় সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব এই ঘটনা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পর্যটন নৌযানের কারিগরি সক্ষমতা ও যাত্রীদের নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।




