শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত, কিন্তু সেই শিক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থাতেই আজ তৈরি হয়েছে গভীর বৈষম্য। এটি সত্যিই হতাশাজনক ও বিস্ময়কর একটি বিষয়। একই ভূখণ্ডে বসবাস করেও স্থানভেদে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধায় রয়েছে বিশাল পার্থক্য, যা মূলত শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যবধানে ফুটে উঠেছে। শহুরে শিক্ষার্থীরা পাঠদানের পাশাপাশি নানা ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করছে, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, অলিম্পিয়াড এবং সেমিনারে অংশগ্রহণের সুযোগ। এই কার্যক্রমগুলো একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিপরীতে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এই সুযোগগুলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।

পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শহরের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস, অভিজ্ঞ শিক্ষকের দিকনির্দেশনা এবং বিভিন্ন ধরণের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের সুযোগ পায়। অনেক সময় টেস্ট পরীক্ষার আগেই তাদের পাঠ্যসূচি শেষ করে আলাদাভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও সেই সমান প্রস্তুতি নেওয়ার পরিবেশ পায় না। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও পর্যাপ্ত ক্লাস না হওয়া, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও প্রযুক্তির অভাব তাদের পথচলায় বাধা সৃষ্টি করে। অথচ তাদের স্বপ্ন, মেধা ও শ্রম শহরের শিক্ষার্থীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

নটর ডেম কলেজের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যে মানসম্মত শিক্ষা ও পরিবেশ পায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী সেই সুযোগ থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত। সরকারি কলেজগুলোতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকলেও, বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ও পরিবেশ ভিন্ন। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার গুণগত মানেরও পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এই বৈষম্যের প্রভাব শুধু বর্তমান শিক্ষাজীবনে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ভবিষ্যৎ জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীর প্রস্তুতির সুযোগ যদি সমান না হয়, তবে তাদের কাছ থেকে সমান ফলাফল প্রত্যাশা করা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত?

এই বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক অসাম্যও। গ্রামের অনেক পরিবার দিনমজুরি, কৃষিকাজ বা ক্ষুদ্র আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যাদের সংসার চালাতেই কষ্ট হয়, তাদের পক্ষে সন্তানকে শহরে রেখে পড়ানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। উচ্চশিক্ষা বা শহরের ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা তখন তাদের কাছে প্রয়োজনের চেয়ে বিলাসিতার মতো মনে হতে পারে। অথচ সেই পরিবারের সন্তানেরও হয়তো বড় স্বপ্ন রয়েছে; সে হয়তো ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিচারক বা শিক্ষক হতে চায়। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থ ও সুযোগের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থেমে যাওয়া উচিত নয়।

তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন, শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। শিক্ষার মান ও সুযোগের বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক। প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান বা পারিবারিক আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে না। শহর কিংবা প্রত্যন্ত গ্রাম—প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সমান সুযোগ পায়। কারণ, মেধার কোনো শহর-গ্রাম নেই, স্বপ্নেরও কোনো ঠিকানা নেই; শুধু প্রয়োজন সুযোগের সমতা।