চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে শহর ও মফস্বল অঞ্চলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা পাসের হার এবং জিপিএ-৫ অর্জনের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও, মফস্বল এলাকার ফলাফল হতাশাজনক। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আওতায় মহানগর এলাকায় পাসের হার ৮৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও, একই বোর্ডের অধীন মাদারীপুর জেলায় এই হার মাত্র ৫৮ শতাংশের কাছাকাছি। চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার প্রায় ৭৪ শতাংশ, যেখানে মহানগরের বাইরে চট্টগ্রাম জেলায় তা ৫৭ শতাংশের মতো। খাগড়াছড়ি জেলায় পাসের হার মাত্র ৩৫ শতাংশ, যা গত বছর ছিল প্রায় ৬১ শতাংশ।

দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ৬৪ শতাংশ হলেও, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের গড় পাসের হার ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য প্রকট। ঢাকা বোর্ডে জিপিএ-৫ পাওয়া ৩৩ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও বেশি (৫৮ শতাংশ) মহানগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে। এ বছর সারা দেশে ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, যার অধিকাংশই মফস্বল এলাকায় অবস্থিত।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শহর ও গ্রামের এই ফলাফলের ব্যবধান ধীরে ধীরে বাড়ছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী উল্লেখ করেছেন, শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ভালো করলেও মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট, একাধিক বিষয়ে একই শিক্ষককে পড়াতে বাধ্য হওয়া এবং অভিভাবকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত এবং শহরের অভিভাবকরা সন্তানদের পড়াশোনায় অধিক ব্যয় করতে সক্ষম।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহানগরের বাইরে ঢাকা জেলার দোহার, নবাবগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও ধামরাই উপজেলাসহ মাদারীপুর, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জ জেলায় পাসের হার ৫৮ থেকে ৬৬ শতাংশের মধ্যে। ঢাকা মহানগরে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, অথচ শরীয়তপুরে এই সংখ্যা মাত্র ২১২। ময়মনসিংহ বোর্ডের চারটি জেলার (শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা) মধ্যে কোনো জেলাতেই পাসের হার ৬১ শতাংশের বেশি নয়।

এ বছর শূন্য পাসের ২২৬টি মাদ্রাসা, ৫৭টি সাধারণ বিদ্যালয় এবং ২৯টি কারিগরি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছর কোনো ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের ঘটনা না ঘটলেও এবার ২৯টি প্রতিষ্ঠান এ তালিকায় এসেছে। শূন্য পাসের মাদ্রাসার সংখ্যা গত বছরের ৮৬টি থেকে বেড়ে এবার ১৪০টি হয়েছে। জয়পুরহাটে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি, যার মধ্যে কালাই উপজেলার ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত পুর মেছাবহুল উলুম (এমইউ) ফাজিল মাদ্রাসাও রয়েছে। ২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ৩১ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত পাঠদান হয় না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সাহেব আলী জানান, ৭৬ বছরের ইতিহাসে এটিই প্রথম এমন ঘটনা এবং খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য তারা বোর্ডে আবেদন করবেন।

একই চিত্র পিরোজপুরের কদমতলার পোরগোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও। আটজন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করেনি। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাসলিমা আক্তার বলেন, শিক্ষক চাহিদার কথা বারবার জানানো হলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় শিক্ষক পাননি তারা। সরকার থেকে শিক্ষক না দিলে কিছু করার নেই বলে জানান তিনি। রাজবাড়ীর জালদিয়া হাইস্কুল ও টাঙ্গাইলের সলিমাবাদ আনোয়ার খান মডেল উচ্চবিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফলও একই রকম শোচনীয়।

এবারের পরীক্ষায় ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ৩৮৪টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য থেকে ১০ শতাংশ, ১ হাজার ২৬৫টিতে ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং ১৪ হাজার ৯১৮টিতে ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মাদ্রাসাপ্রধানদের ডেকেছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. ফারুক আহম্মেদ জানান, আগামী রোববার থেকে অঞ্চলভিত্তিক মাদ্রাসাপ্রধানদের ডেকে সমস্যার কারণ জানতে চাওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে এনে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।