রাজধানীর একটি হোটেলে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বক্তব্য দেন। সেখানে প্রধান অতিথির ভূমিকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতার আলোকে এ দেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের মৌলিক পরিচয় ‘বাংলাদেশি’। তাঁর মতে, বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই; বরং সবাই ‘অধিবাসী’।

একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক। মন্ত্রীদের এই দুই মন্তব্যের পরপরই বুধবার জাতীয় আদিবাসী পরিষদ একটি বিবৃতি প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।

বুধবার প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি বিচিত্রা তির্কি ও সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাঁদের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের আদিবাসীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকার করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষাবৈচিত্র্যের দেশ। বাঙালি ও আদিবাসী—উভয়েই এ দেশের নাগরিক। কিন্তু বাঙালিরা আদিবাসী নন, আবার আদিবাসীরাও বাঙালি নন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের আদিবাসী জাতিসত্তার মানুষেরা নিজেদের পরিচয়ের জন্য ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছেন।

উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুরসহ সিলেট ও খুলনা বিভাগে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁও, বেদিয়া (মাহাতো), কুর্মি (মাহাতো), রাজোয়ার, তুরি, লোহার, মালো, পাহাড়িয়া বা মালপাহাড়িয়া, গঞ্জু, ভূমিজ, বাগদি, মাহালী, মুসহর, কোল, ভূইমালি, বড়াইক, কোচ, তেলী, গড়াইত, নুনিয়া, ভুইয়া, রবিদাস, রাজভর, কাদর, হাড়ি ও পাটনিসহ ৩৮টির বেশি জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করেন। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দাবি, এসব জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি।

‘আদিবাসী’ পরিচয় শুধু সামাজিকভাবে ব্যবহৃত শব্দ নয়; শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নীতিতেও এর প্রয়োগ রয়েছে বলে সংগঠনটি উল্লেখ করে। ১৯৪৪ সালে নওগাঁর বদলগাছীতে পাহাড়পুর বা সোমপুর বৌদ্ধবিহারের কাছে ‘পাহাড়পুর আদিবাসী উচ্চবিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া উত্তরবঙ্গেই ‘আদিবাসী’ নামযুক্ত ৬৫টির বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু আছে।

২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে বলেছিলেন, ‘আমাদের জনগোষ্ঠীরই একটি অংশ আদিবাসী। আদিবাসীরাও আর সকলের মতোই সমান মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশের নাগরিক।’—এই উদ্ধৃতি বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়।

সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি না থাকলেও দেশের বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় এটি ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’-এর তফসিলে উল্লিখিত বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের আদিবাসীসহ সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ সাধন। পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৭ ধারায় ‘আদিবাসী’ উল্লেখ করে ভূমি রক্ষার বিধান রয়েছে বলেও সংগঠনটি জানায়।

বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এমন মত প্রকাশ করে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ। একই সঙ্গে ‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে অপরাজনীতি বন্ধ করার দাবিও জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।