জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, খসড়া আইন দুটিতে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা পালনে যেসব বিষয় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলো বহাল রাখা হয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়ায়ও দায়মুক্তি সহায়ক বিভিন্ন ধারা রাখা হয়েছে। বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন। গত ১০ আগস্ট সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইন দুটির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন। এর আগে পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের গুম-খুনসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার কী শিক্ষা নিয়েছে, সেই প্রশ্নও তুলেছে টিআইবি।

বিবৃতিতে বলা হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বেশির ভাগ ঘটনায় শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত থাকার অভিযোগ থাকে। কিন্তু মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনে ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারা হুবহু রেখে দেওয়া হয়েছে, ফলে এসব ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা বাহিনীর প্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হবে। ২০০৯ সালের আইনের এই দুর্বলতার কারণেই কমিশন কখনোই ‘এ’ ক্যাটাগরির মর্যাদা পায়নি এবং অপরাধের জবাবদিহি বা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন এমপি এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখা হয়েছে। বাকি তিন সদস্যের মধ্যে অন্তত দুজনের মনোনয়ন সরকারের হাতে থাকায় কমিশনে সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাঁচ সদস্যের কমিশনে মাত্র একজন নারী সদস্য রাখা এবং বাছাই কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্বের বাধ্যবাধকতা না থাকায় এই ব্যবস্থাকে পুরুষতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক বলেও মন্তব্য করেছে টিআইবি। সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়েও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

যদিও খসড়ায় কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বলা হয়েছে, তবে প্রতিষ্ঠানটি কোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনে হবে তা পরিষ্কার নয়। ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপন, কর্মকর্তা নিয়োগ, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রেষণে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ এবং চাকরিরত অবস্থায় কমিশনার হওয়ার বিধান কমিশনকে কার্যত সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি। এমন পরিস্থিতিতে রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভীষ্ট অর্জন এবং সরকারি দলের ৩১ দফা বা নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে এই খসড়া সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক কি না, প্রশ্ন তুলেছেন ইফতেখারুজ্জামান। ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে অজুহাত অগ্রহণযোগ্য’ বিধানটি খসড়া থেকে বাদ দেওয়ায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়া পরিদর্শনের এখতিয়ার থেকে ‘সামরিক আটক কেন্দ্র’ বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চেয়ে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, এতে কি আয়নাঘর বহাল রাখার পক্ষে সরকারের সমর্থন আছে বলে ধরে নেওয়া যায়?

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়ায় গুমের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেছে টিআইবি। তদন্তের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকার কমিশনের বাইরে রেখে এককভাবে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে। অথচ গুমের বেশির ভাগ ঘটনায় শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে অধস্তন তদন্তকারী কর্মকর্তার ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের’ ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেট ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই বিধান যে গুম প্রতিরোধে সহায়ক নয়, বরং বিচারহীনতা নিশ্চিত করবে বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি। খসড়ায় গুমের সংজ্ঞায় জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততাকে অন্তর্ভুক্ত না করার অভিযোগও আনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনের যে ক্ষমতা ছিল—আটক রক্ষাকবচ প্রতিপালন পর্যবেক্ষণ, কারাগার-হাজতখানা পরিদর্শন, গোপন আটককেন্দ্র শনাক্ত করা—তা খসড়ায় রাখা হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, মানবাধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্রসংস্কারের অভীষ্ট এবং বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়ে ভুক্তভোগী ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে খসড়া দুটি ঢেলে সাজিয়ে সংসদে উত্থাপনের দাবি জানিয়েছে টিআইবি।