সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগসহ বিভিন্ন আদালত কক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। বুধবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে এক অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন 'ল রিপোর্টার্স ফোরাম' (এলআরএফ) এই কর্মসূচির আয়োজন করে। একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগসহ আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের দাবিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি’।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত ৭ জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগসহ হাইকোর্টের বিভিন্ন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রায় সাত মাস ধরে চলে আসা এই সীমাবদ্ধতার কারণে বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার অধিকার খর্ব হচ্ছে। সাংবাদিক নেতারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, অবিলম্বে এই বাধা দূর করা না হলে তারা আপিল বিভাগে শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করবেন, যার তারিখ ও সময় পরবর্তীতে জানানো হবে।
অনুষ্ঠানে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বিচারকার্য জনসমক্ষে এবং উন্মুক্ত আদালতে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ যখন সংবিধানের অধিকার রক্ষা করার দায়িত্বপ্রাপ্ত, তখন তারা নিজেই সেই অধিকার লঙ্ঘন করছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। তিনি অনুরোধ জানান, সর্বোচ্চ বিচার কর্তৃপক্ষ যেন সংবিধানে বর্ণিত প্রকাশ্য বিচারিক প্রক্রিয়ার নির্দেশনা ভঙ্গ করে নিজেদের অভিযুক্ত না করেন এবং বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। নূরুল কবীর আরও জানান, তিন দিন আগে তিনি রেজিস্টারের মাধ্যমে এই বিষয়ে আলোচনার জন্য সাক্ষাতের আবেদন জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাননি।
ল রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি ও ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বিচার হতে হবে প্রকাশ্য আদালতে এবং কোনোভাবেই জনগণের জানার অধিকার সংকুচিত বা বন্ধ করা যাবে না। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে শুধু সাংবাদিক নয়, অনেক বিচারপ্রার্থীও আপিল বিভাগে প্রবেশ করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য তিনি ঢাকার সকল সাংবাদিককে নিয়ে একদিন সুশৃঙ্খলভাবে সুপ্রিম কোর্টে বসার ডাক দেন। একই সঙ্গে তিনি প্রস্তাব করেন, আদালত কক্ষের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন ও সাংবাদিকদের আলোচনার মাধ্যমে একটি আচরণবিধি বা নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে, যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক সাংবাদিক ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান। তিনি এই প্রবেশ নিষেধের আদেশটিকে কোনো বিচারিক বা প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং একটি 'মৌখিক আদেশ' হিসেবে অভিহিত করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, বিচারব্যবস্থায় 'দৃষ্টান্তমূলক বিচার' প্রবর্তনের জন্য তা সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে অপরাধীরা সতর্ক হয়। গণমাধ্যম যদি তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করতে না পারে, তবে বিচার দৃষ্টান্তমূলক হয় না। তাই তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রধান বিচারপতির প্রতি অনুরোধ জানান। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন আশা প্রকাশ করেন যে, প্রধান বিচারপতির উদ্যোগেই সাংবাদিকদের বাক্ ও লেখার স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হবে।
ল রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মুহাম্মদ ইয়াছিন প্রশ্ন তোলেন, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, তখন সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশ কেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে? তিনি বিশ্বাস করেন, প্রধান বিচারপতি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে প্রবেশাধিকার প্রদান করবেন। ল রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্নারের সঞ্চালনায় এই কর্মসূচিতে ডিআরইউ-এর সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ, রিপোর্টার্স এগেইনস্ট করাপশনের সভাপতি শাফি উদ্দীন আহমদ এবং আরও অনেকে উপস্থিত থেকে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।




