আজ ৩১ জুলাই, ২০২৬। দুই বছর আগের সেই দিনটির কথা ভুলতে পারেন না আলতাফ হোসেন ও সাদিয়া আক্তার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাদের ছেলে সাদাফ বাসা থেকে বেরিয়েছিল প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা বলে। দুপুরের আগেই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে রওনা হয়েছিল। কিন্তু দুপুর পেরিয়ে বিকেল, সন্ধ্যা, রাত— কেউ আর ফিরল না।

সেদিন সকালে সাদাফের পড়ার টেবিলে খোলা ছিল সাধারণ গণিতের খাতা। জ্যামিতির একটি ত্রিভুজ অর্ধেক আঁকা ছিল, পেনসিলটি খাতার ভাঁজেই রাখা ছিল। বাইরে আগস্টের তপ্ত বাতাস, আর ঘরের ভেতর ছিল হিমশীতল নীরবতা।

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে আলতাফ হোসেনের ফোন বেজে উঠল। সাদাফের কল। কাঁপা কণ্ঠে সে জানাল, সে বাইপাইল মোড়ের কাছে আছে। চারদিকে গুলি হচ্ছে। তার সামনেই একজনের মাথায়, আরেকজনের কোমরে, আরেকজনের পেটে গুলি লেগেছে। আলতাফ সাহেব তাকে যেভাবেই হোক ফিরে আসতে বললেন। সাদাফ বলল, ‘চেষ্টা করছি, বাবা। আমি আসব। তুমি চিন্তা কোরো না।’ তারপর মুহুর্মুহু গুলির শব্দ, আর একটি আস্ত ‘আচ্ছা’— যেন মহাকালের ওপার থেকে এল। লাইন কেটে গেল।

আলতাফ সাহেব বারবার ফোন করলেন, কিন্তু আর সংযোগ হলো না। রাত জুড়ে তিনি অপেক্ষা করলেন। প্রতিবার গেটের সামনে গাড়ির শব্দ হলে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন। দূরে কোনো কিশোরের কণ্ঠ শুনলেই মনে হয়েছে, ছেলে ফিরেছে। রান্নাঘরে ভাত ঠান্ডা হয়েছে, সাদাফের জন্য থালা সাজানোই রইল।

সেদিন দুপুরের পর থেকেই আশুলিয়ার জামগড়া, ইউনিক আর শিমুলতলা এলাকায় মানুষের ঢল নামে। চারদিকে স্লোগান, মানুষের চোখেমুখে অদ্ভুত উত্তেজনা। স্বৈরাচারীর পতন হয়েছে— এই খবর বাতাসে ভাসছিল, কিন্তু আশুলিয়া থানার মোড়টা ছিল থমথমে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় অবস্থান নেন। বেলা একটার দিকে তাঁরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়েন। পুলিশও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। বাইপাইল এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। ওই সময়ে ২০-২৫ জন ছাত্র-জনতা নিহত হন এবং অনেকেই আহত হন।

বেলা দুইটার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে প্রধানমন্ত্রী পালিয়েছেন। চারদিক থেকে মুহুর্মুহু মিছিল বের হয়। তিনটার দিকে থানার মোড়ে মিছিল পৌঁছালে চারদিক কেঁপে ওঠে সাউন্ড গ্রেনেড আর গুলির শব্দে। আনন্দ মিছিল রূপ নেয় নরকে। সাদাফ দৌড়ানোর সুযোগ পায়নি। একটি তপ্ত সিসার বুলেট এসে বিঁধে তার বুকে। পিচঢালা রাস্তায় ফুটে ওঠে তার তাজা রক্ত।

সন্ধ্যার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। একটি রিকশা ভ্যানের ওপর স্তূপ করে রাখা মানুষের লাশ। হাত-পাগুলো ঝুলে আছে জড়বস্তুর মতো। পুলিশের পোশাকে কয়েকজন সেই লাশের ওপর আরও লাশ ছুড়ে ফেলছে। তারপর সেই তাজা লাশের স্তূপে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ছয়টি লাশ পলিথিনের প্যাকেটে করে মসজিদের কাছে ফেলে রাখা হয়। স্থানীয় লোকজন লাশগুলোর জানাজা পড়ান।

ভোর হলে আলতাফ সাহেবের কাছে আরেকটি ফোন এল। অচেনা নম্বর থেকে। ওপাশের মানুষটি কাঁপা কণ্ঠে নিজের পরিচয় দিলেন। আলতাফ সাহেব শুধু একটি প্রশ্ন করলেন, ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে?’ ওপাশে নীরবতা। তারপর এমন একটি উত্তর, যার পরে পৃথিবীর সব শব্দ অর্থহীন হয়ে যায়। সাদাফকে পাওয়া গেছে, কিন্তু সে আর ফিরবে না। ওই জ্বলন্ত ভ্যানে লাশের স্তূপের একদম নিচে ঝুলে থাকা পা দুটো সাদাফের। পরনের ব্লু জিনসের সঙ্গে স্কাই ব্লু শার্টটি সাদাফকে কিছুদিন আগেই কিনে দিয়েছিলেন আলতাফ সাহেব। আগুনে সেই প্যান্ট পুড়ছিল, একপর্যায়ে পুরো শরীর কয়লা হয়ে যায়।

দুই বছর পার হয়ে গেছে। পড়ার টেবিলের ওপর জ্যামিতির খাতাটা ওভাবেই পড়ে আছে। সাদাফের আঁকা অর্ধেক ত্রিভুজটা আর কোনো দিন পূর্ণতা পাবে না। সাদিয়া আক্তার সেগুলো পরিষ্কার করে আগের জায়গায় রাখেন। তিনি বলেন, ‘ছেলে ফিরে আসে না। তবে কান পাতলে আশুলিয়ার বাতাসে এখনো যেন একটা চঞ্চল কণ্ঠস্বর শুনতে পাই: “মা, আমি আসছি।” পরক্ষণেই হুহু করে ওঠে আমার বুকটা।’

আলতাফ সাহেবের এখনো ভালো ঘুম হয় না। তিনি মাঝেমধ্যে আলমারির ড্রয়ার থেকে পুরোনো ফোনটি বের করেন, চার্জ দিয়ে কললিস্ট খুলে দেখেন। একটি নাম এখনো সেখানে জ্বলজ্বল করে— সাদাফ। কললিস্টে ছেলের নামের পাশে লেখা: ‘শেষ কল’। তিনি নম্বরটিতে কল দেন, ওপাশে কেউ সাড়া দেয় না। তারপর ফোনটি নিঃশব্দে বন্ধ করে আলমারিতে রেখে দেন।