বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলার তিনটি নবগঠিত ইউনিয়নের নাম প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বদলানোর ঘটনা একটি রাষ্ট্রীয় নজির সৃষ্টি করেছে। এই দৃষ্টান্ত কি কেবল বগুড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে— এমন প্রশ্নের মাঝে পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলের জোরপূর্বক বদলে দেওয়া রাখাইন স্থাননাম ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের পাশেই রয়েছে একাধিক প্রাচীন রাখাইন বসতি, যাদের একসময়ের নাম এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। যেমন কুয়াকাটার আদি রাখাইন নাম 'ক্যানছাই চোওয়ান'। সৈকতের ধারে প্রাচীন এক রাখাইন গ্রামের নাম ছিল 'নাঙিরি রোওয়া', যার অর্থ শ্যামলাটা রঙের মানুষদের পাড়া। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লতাচাপলী ইউনিয়নে অবস্থিত এই গ্রামটি এখন পরিচিত 'নাইওরীপাড়া' নামে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা মাথেনের কথায় ইতিহাসের নির্মম বদলের চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি জানান, তার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সৈকতের ধারে আবাদ করে একটি জঙ্গল গড়ে তুলেছিলেন, যা তার পূর্বপুরুষ 'ল্যুম ফ্রু মাতবর'-এর নামে 'ল্যুম ফ্রুর বন' নামে পরিচিতি পায়। ল্যুম ফ্রু শব্দের অর্থ লম্বা-ফরসা মানুষ। পরবরতীতে বাঙালিরা এই নাম পরিবর্তন করে 'লেবুর বন' রাখে। মাথেনের ক্ষোভ, ‘এখানে কোনো লেবুগাছ নেই, অথচ যে মানুষটি বন রক্ষা করল, তার নামটাও মুছে ফেলা হয়েছে।’ কুয়াকাটা পৌরসভার সাইনবোর্ড ও সড়ক বিভাগের মাইলফলকে এখন তা 'লেবুবন' নামে চিহ্নিত। এমনকি ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা রিজিয়ন তাদের তথ্যে লেবুর বনের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে, যেখানে ‘লেম্বু’ নামের কোনো রাখাইন নারীর কথা বলা হয়েছে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরিশাল বিভাগে রাখাইন জনগোষ্ঠীর আবাসিক প্রায় প্রতিটি স্থাননামের 'বাঙালীকরণ' ঘটেছে। বরগুনার আমতলীর নাম আসলে 'অ্যামপ্রুই' রাখাইনের স্মৃতি থেকে এসেছে, তালতলী এসেছে 'তাতলী' থেকে, যার রাখাইন অর্থ সীমানা। অথচ প্রচলিত বিশ্বাসে বলা হয়, আমগাছ থেকেই আমতলী এবং তালগাছ থেকে তালতলী নাম এসেছে। একইভাবে, 'ক্যহ্লাউ' ও 'খ্যাপ্রু' দুই সহোদর রাখাইন ভাইয়ের নামানুসারে গড়ে ওঠা পাড়া আজ 'কলাপাড়া' ও 'খেপুপাড়া' নামে পরিচিত। 'হ্যুইছেনপাড়া' হয়েছে 'হোসেনপাড়া'। বিখ্যাত রাখাইন কবিরাজ 'মাও প্রু সাই'-এর নামে গড়ে ওঠা গ্রাম 'মাও প্রু সাই রোওয়া' এখন 'পক্ষিয়াপাড়া'। কুয়াকাটার মিশ্রীপাড়ার আদি নাম ছিল 'ঙে সুয়ে গুং', যার অর্থ স্বর্ণপাখির উঁচু জায়গা। তালতলীতে এক রাখাইন গ্রাম 'জোজিতংব' বা ঋষিটিলা এখন রাখাইনশূন্য হয়ে পরিচিতি পেয়েছে 'জাকিরতবক' নামে। এছাড়াও ডংকুপাড়া হয়েছে রসুলপুর, পুনামাপাড়া হয়েছে ইসলামপুর—এমন অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।
স্থাননাম বদলের এই ধারায় একই সাথে বেদখলেরও চিত্র ধরা পড়ে। অভিযোগ, রাখাইনদের গ্রাম, কৃষিজমি, পুকুর, ধর্মস্থান, শ্মশান ও বিহার দখল হয়ে গেছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে রাখাইন জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ হাজার, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৩ হাজার ৬১০-এ। এক দশক আগে গবেষক ড. জগন্নাথ বড়ুয়া লিখেছিলেন, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনার রাখাইন বসতি 'হীন থেকে হীনতর' হচ্ছে এবং একদিন এসব অঞ্চলের রাখাইন সংস্কৃতি মুছে যাবে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রতিপন্ন করছে।
স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারের ভান্তেরা ভূমি দখলের করুণ কাহিনি শোনান। তবে পর্যটন ও বাণিজ্যের নামে প্রকৃতির প্রতি অপরায়ণতা, দূষণ ও দখল দিয়ে কোনো বিকাশ সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। যাদের নাম বদলে সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়েছে, তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েই স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দারা শামসুদ্দীনের মতে, ব্যক্তিনাম ব্যক্তিগত হলেও স্থাননাম একটি জাতীয় বিষয়। প্রতিটি স্থাননামের সঠিক ও অনন্য রূপ সংরক্ষণ এবং তা জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করা এক জাতীয় প্রয়োজন। রাখাইন জনপদ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া এই স্থাননামগুলো জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং রাষ্ট্রকে এসব নামের ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে।




