গণিতের বিশাল পরিমণ্ডলে সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত নিয়মটি হলো পিথাগোরাসের উপপাদ্য। সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর মধ্যে যে একটি সহজ, নিখুঁত ও চমৎকার সম্পর্ক বিরাজ করে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। এই উপপাদ্যটি বলে, যেকোনো সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের ওপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল অন্য দুই বাহুর ওপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের যোগফলের সমান। বীজগণিতের ভাষায় যা দাঁড়ায়: a² + b² = c²। অর্থাৎ অতিভুজ (c) এর বর্গ হবে ভূমি (a) ও লম্বের (b) বর্গের যোগফলের সমান।
অনেকে মনে করেন পিথাগোরাস একদিন হঠাৎ করেই এই নিয়মটি আবিষ্কার করেন। কিন্তু ইতিহাস তার চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। গ্রিক পণ্ডিত পিথাগোরাসের জন্মেরও প্রায় হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনের (বর্তমান ইরাক) স্থপতিরা ৩, ৪ ও ৫ একক মাপের ত্রিভুজ দিয়ে সমকোণ তৈরি করতে জানতেন। প্রাচীন ব্যাবলনের একটি পোড়ামাটির ফলক 'প্লিম্পটন ৩২২'-এ কিউনিফর্ম হরফে পিথাগোরিয়ান ট্রিপলেট বা ত্রয়ীর তালিকা পাওয়া যায়। একইভাবে, তারও কয়েক শতক আগে ভারতীয় গণিতজ্ঞ বৌধায়ন তাঁর 'শুল্বসূত্রে' একই ধারণা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। প্রাচীন ভারতে যজ্ঞের বেদি তৈরিতে গ্রন্থি দেওয়া দড়ির মাধ্যমে পূর্ণসংখ্যার ত্রয়ী (যেমন ৩-৪-৫) ব্যবহার করা হতো। মিশরে পিরামিড তৈরি ও নীলনদের অববাহিকায় জমি পরিমাপের কাজেও ১২টি সমান ভাগে বিভক্ত গিঁট দেওয়া দড়ি ব্যবহার করে ৩:৪:৫ অনুপাতের সমকোণী ত্রিভুজ গঠন করতো স্থপতিরা। ধারণা করা হয়, থেলিস ও পিথাগোরাস মিশর ভ্রমণেই জ্যামিতির এই প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। অন্যদিকে চীনে এই নিয়মটি পরিচিত ছিল 'গৌ-গু' উপপাদ্য নামে।
প্রাচীন এই সভ্যতাগুলো মূলত ব্যবহারিক কাজেই নিয়মটি প্রয়োগ করলেও, পিথাগোরাস বা তাঁর অনুসারীরাই প্রথম এটিকে গাণিতিক যুক্তির দ্বারা সার্বিকভাবে প্রমাণ করেন। এই ত্রয়ী সংখ্যার একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো ব্যাবলনের প্রাচীন ধাঁধা: ৫ একক লম্বা একটি মই দেয়ালে খাড়া অবস্থায় আছে। ওপরের অংশ এক একক নিচে পিছলে গেলে নিচের অংশটি দেয়াল থেকে কত দূরে সরে যাবে? এখানেও ৩-৪-৫ ত্রিভুজটির প্রকাশ দেখা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, ৩-৪-৫ কেবল একটি পূর্ণসংখ্যার বিশেষ ক্ষেত্র। এই সূত্রের আসল শক্তি হলো, বাহুর দৈর্ঘ্য যেকোনো সংখ্যা, ভগ্নাংশ বা অমূলদ সংখ্যা হোক না কেন, ত্রিভুজটি সমকোণী হলেই সম্পর্কটি সঠিক থাকবে।
এই সূত্রের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অপ্রত্যশিত রহস্য, যা প্রাচীন গণিতবিদদের তীব্র ধাক্কা দেয়। ১ একক বাহুবিশিষ্ট একটি বর্গক্ষেত্রের কর্ণের দৈর্ঘ্য হয় √২। পিথাগোরীয় দল বিশ্বাস করতেন, বিশ্বের সবকিছু পূর্ণসংখ্যা ও তাদের অনুপাত (ভগ্নাংশ) দ্বারা গঠিত। কিন্তু তারা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে ফেলেন যে √2 কোনো মূলদ সংখ্যা (যা দুটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করা যায়) নয়, বরং এটি একটি অমূলদ সংখ্যা। দশমিকের পর এর অংকগুলো অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে, কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্নে পুনরাবৃত্তি না হয়েই। সংস্কৃতে 'মূল' শব্দের অর্থ পরিমাপযোগ্য মান এবং 'দ' অর্থ প্রদানকারী। যে রাশির নিখুঁত মান বের করা সম্ভব, তা-ই মূলদ; আর যার মূল বের করা যায় না, তা 'অমূলদ'। √2 আবিষ্কার পিথাগোরিয়ানদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে চুরমার করে দিয়েছিল। কথিত আছে, হিপাসাস নামের এক পিথাগোরিয়ান সদস্য এই গোপন তথ্য প্রকাশ করলে তা্রিত ক্ষুদ্ধ হয়ে তাঁকে সমুদ্রে জাহাজ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। কিন্তু সত্যকে তো আর ডুবিয়ে রাখা যায় না। পরে ইউক্লিড তাঁর 'এলিমেন্টস' বইতে সংখ্যাকে জ্যামিতিক রেখাংশের দৈর্ঘ্য দিয়ে প্রকাশের রীতি চালু করেন।
এই উপপাদ্যটির এপর্যন্ত ৩৭০টিরও বেশি ভিন্ন প্রমাণ নিবন্ধিত হয়েছে। ই. এস. লুমিস তাঁর 'দ্য পিথাগোরিয়ান প্রপোজিশন' (১৯২৭) বইতে এগুলো সংকলন করেন। সহজ একটি প্রমাণ হলো: একটি বড় বর্গের চার কোণায় (a, b, c বাহুবিশিষ্ট) ৪টি সমকোণী ত্রিভুজ সাজানো হলো। মাঝখানে অতিভিজ c দিয়ে একটি ছোট বর্গ গঠিত হয়। ত্রিভুজগুলোকে এক পাশে সরালে দুটি বর্গ (a² ও b²) তৈরি হয়, যা প্রমাণ করে c² = a² + b²।
বীজগণিতের মাধ্যমেও একটি সরল প্রমাণ জন ওয়ার্ডের 'ইয়াং ম্যাথম্যাথিশিয়ানস গাইড' (১৭০৭) এ দেখানো হয়: (a+b) বাহুবিশিষ্ট বড় বর্গের ক্ষেত্রফল (a² + 2ab + b²) হলো মাঝের বর্গ (c²) ও 4টি ত্রিভুজের (মোট 2ab) যোগফলের সমান। দুই পাশ থেকে 2ab কাটাকাটি গেলে অবশিষ্ট থাকে a² + b² = c²।
দ্বাদশ শতাব্দীর ভারতীয় গণিতজ্ঞ ভাস্করাচার্য তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'লীলাবতী'-তে একটি ছবি এঁকে নিচে শুধু 'পশ্য' (অর্থাৎ দেখো) লিখেছিলেন। ছবিটিতে একটি বড় বর্গে 4টি ত্রিভুজ সাজিয়ে দেখানো হয় যে, মাঝের ছোট বর্গের (b-a) বাহুর ক্ষেত্রফল ও ত্রিভুজগুলোর মোট ক্ষেত্রফলের যোগফলই হলো c²। কাগজ-কলমের জটিল হিসাব ছাড়াই এ ছিল দৃশ্যগত প্রমাণের এক নিদর্শন।
প্রাচীন চীনেও 'ঝৌ বি সুয়ান জিং' গ্রন্থে 'গৌ-গু' উপপাদ্যের অনুরূপ প্রমাণ পাওয়া যায়। 4টি ত্রিভুজ ও মাঝের খালি বর্গের যোগফল থেকেও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। তবে ভাষা ও টার্মের অনুবাদের জটিলতার কারণে এটি সত্যিকারের জ্যামিতিক প্রমাণ নাকি বর্ষপঞ্জির হিসাব, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। যদিও গ্রিকদের আগেই চৈনিকরা ৩-৪-৫ ত্রিভুজের ব্যবহারিক প্রয়োগে দক্ষ ছিলেন।
পিথাগোরাস নিজে যে প্রমাণ দিয়েছিলেন, তা এতটাই জটিল ও বহু রেখাখচিত ছিল যে শিক্ষার্থীরা তাকে 'উইন্ডমিল' বা 'ময়ুরের লেজ' বলে পরিহাস করত। পরে ইউকিল্ড তাঁর 'এলিমেন্টস'-এর প্রথম খণ্ডের ৪৭ নম্বর উপপাদ্যে বিশুদ্ধ জ্যামিতিক যুক্তি ও ত্রিভুজের সর্বসমতার মাধ্যমে যে প্রমাণ দেন, গণিতের ইতিহাসে তাকেই সবচেয়ে নিখুঁত ও কঠোর হিসেবে গণ্য করা হয়।




