শিশুদের সব দুষ্টুমি যে নিষ্ঠুরতা নয়, তা বোঝা জরুরি। কখনো কৌতূহল বা না বুঝে কোনো প্রাণীকে জোরে ধরা, পোকা মারা বা বন্ধুকে ধাক্কা দেওয়া শিশুসুলভ আচরণের অংশ। কিন্তু যদি কোনো শিশু বারবার ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ পায়, অনুশোচনা না দেখায়, দুর্বল কাউকে টার্গেট করে এবং প্রাণী বা মানুষকে কষ্ট দেয়, তবে সেটি গুরুতর সংকেত। ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা ও গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের পুনরাবৃত্ত নিষ্ঠুরতা কনডাক্ট ডিজঅর্ডার নামক আচরণগত ব্যাধির একটি অন্যতম লক্ষণ।

এই আচরণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করে। শিশু যদি ঘরে বা আশপাশে সহিংসতা দেখে বড় হয়, তবে সে শেখে যে ক্ষমতার অর্থ দুর্বলকে আঘাত করা। নিজে অবহেলা, অপমান, শারীরিক শাস্তি বা বুলিংয়ের শিকার হলেও শিশু এই আচরণ করতে পারে। আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অতিরিক্ত চঞ্চলতা, এডিএইচডি, শেখার সমস্যা, ট্রমা বা ডিপ্রেশনও দায়ী হতে পারে। সহানুভূতি শেখার সুযোগ না পাওয়া, অতিরিক্ত মারামারির কনটেন্ট দেখা, এবং ঘরে বিশৃঙ্খল পরিবেশ বা অতিরিক্ত কঠোর শাস্তির প্রবণতাও এই আচরণকে উসকে দেয়।

অভিভাবকের করণীয় কী? প্রথম কাজ হলো আচরণটি অস্বীকার না করা, তবে শিশুকে ‘জন্মগতভাবে খারাপ’ বা ‘দানব’ বলে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়। শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে বোঝাতে হবে যে রাগ হতে পারে, কিন্তু কাউকে আঘাত করা যাবে না। শিশুর আচরণ কয়েকদিন নজরদারিতে রাখতে হবে। শাস্তির বদলে যৌক্তিক পরিণতি প্রয়োগ করা জরুরি। যেমন প্রাণীকে কষ্ট দিলে একা প্রাণীর কাছে যেতে না দেওয়া, বড়দের সঙ্গে থেকে প্রাণীর যত্ন শেখানো, ক্ষতি হলে তা ঠিক করার দায়িত্ব দেওয়া। পাশাপাশি ভালো আচরণের প্রশংসা করতে হবে—‘আজ তুমি রাগ হলেও মারোনি, এটি ভালো সিদ্ধান্ত’—এমন মন্তব্য শিশুকে উৎসাহিত করবে।

সহানুভূতি শেখানোর জন্য শিশুকে শান্তভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতি বোঝাতে হবে। যেমন ‘ওর শরীর কাঁপছে, সে ভয় পেয়েছে’ অথবা ‘তোমার বন্ধুটি চুপ হয়ে গেছে, কারণ সে কষ্ট পেয়েছে’—এমন বাক্য ব্যবহার করে শিশুকে অন্যের অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করা যায়। ‘তুমি রাগ করেছ, কিন্তু আঘাত না করে কথা বললে সমস্যার সমাধান হবে’—এমন নির্দেশনা কার্যকর। গল্প, বই, পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া এবং ছোটদের সাহায্য করার মতো কাজ সহানুভূতি গড়ে তুলতে সহায়ক।

এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে বুলিং বা নিষ্ঠুর আচরণকে ‘বাচ্চাদের ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে গেলে চলবে না। ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার নথি রাখা, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং স্পষ্ট অ্যান্টি-বুলিং নীতি তৈরি করা জরুরি। যে শিশু এই ধরনের আচরণ করছে, তার জন্য পৃথক আচরণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ এসব পরামর্শ দিয়েছেন, যা অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।