ইংল্যান্ডের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাকাঠামোতে একটি যুগান্তকারী রদবদলের কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন রূপরেখা অনুযায়ী, নবম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা অংক, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো অপরিহার্য পাঠ্যসূচির বাইরে গিয়ে নির্মাণ, সাইবার নিরাপত্তা, কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উৎপাদনশিল্পের মতো ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত বিষয় পড়ার সুযোগ পাবে।

সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, স্থানীয় শিল্পের চাহিদার ভিত্তিতে এই কোর্সগুলো প্রণয়ন করা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল পুঁথিগত বিদ্যাই আয়ত্ত করবে না, বরং চাকুরীর বাজারে টিকে থাকার মতো বাস্তব দক্ষতা গড়ে তুলতে পারবে এবং একই সাথে স্থানীয় নিয়োগকর্তাদের সঙ্গেও যোগসূত্র স্থাপনের সুযোগ পাবে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের ব্যবস্থাও রাখা হবে।

সরকার এই পরিকল্পনাকে শিক্ষাব্যবস্থায় একটি 'মৌলিক পরিবর্তন' হিসেবে চিহ্নিত করলেও, ঠিক কীভাবে এটি বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম টাইমস পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে হাতে-কলমে কাজ ও কারিগরি জানাশোনার গুরুত্ব কমেনি, বরং তা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

ভবিষ্যতের ব্রিটেনে দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, প্রকৌশলী, সাইবারও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং উৎপাদন বিশেষজ্ঞদের চাহিদা যে আরও বাড়বে, সেটি তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বে কারিগরি শিক্ষা মূল তালিকামের বাইরে ছিল, কিন্তু নতুন কাঠামোতে সেটিই হয়ে উঠবে শিক্ষার কেন্দ্রীয় উপাদান।

এই পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীরা অপরিহার্য বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি নিজেদের পছন্দ ও আগ্রহের ভিত্তিতে যে কোনো কারিগরি বিদ্যা নির্বাচন করতে পারবে। এর মানে হচ্ছে, একই সঙ্গে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও প্রায়োগিক শিক্ষা গ্রহণের পথ খোলা থাকবে। বার্নহ্যাম বলেন, কয়েক দশক ধরে ছাত্রছাত্রীদের বলা হয়েছে যে সম্মান পাওয়ার জন্য শুধু তাত্ত্বিক বিষয়ে ভালো ফল করা জরুরি। কিন্তু এখন থেকে নির্মাণ, কোডিং, উৎপাদন শিল্প বা যন্ত্রকৌশল— যেই পথই কেউ বেছে নিক না কেন, তার প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সমতুল্য মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।

শুধু শিক্ষাব্যবস্থা বদলানোই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য নয়। সরকারি দাবি, এটি যুক্তরাজ্যের ঊর্ধ্বমুখী যুব বেকারত্ব কমানোর একটি বড় হাতিয়ার। চলতি বছরের তথ্য বলছে, দেশটিতে বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশী তরুণ এমন অবস্থায় আছেন যারা শিক্ষা, চাকরি অথবা প্রশিক্ষণ— কোনোটির সঙ্গেই সম্পৃক্ত নন। গত ১২ বছরের পরিসংখ্যান বিবেচনায় এটিই সর্বোচ্চ। সরকারের বিশ্বাস, উন্নত কারিগরি শিক্ষা ও স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে যুব সমাজের সংযোগ ঘটাতে পারলে এই চিত্র বদলে যাবে।

বিবিসির খবর মতে, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের নির্বাচিত কিছু অঞ্চলে এই নতুন শিক্ষাপদ্ধতি কার্যকর করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফস্টেড ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের সময় সেখানকার কারিগরি শিক্ষার গুণগত মানও বিবেচনা করবে। তবে বর্তমান জিসিএসই নির্ভর মূল্যায়নের সাথে এটি কীভাবে সংহত হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।

এটি উল্লেখযোগ্য যে, ঘোষিত এই সংস্কার শুধুমাত্র ইংল্যান্ডের জন্যই প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা একটি বিকেন্দ্রীভূত নীতিক্ষেত্র। তবে ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার বিস্তারে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন এই উদ্যোগ মূলত গ্রেটার ম্যানচেস্টারে প্রচলিত Greater Manchester Baccalaureate (MBacc) কর্মসূচির সাফল্যের ওপর ভর করে অগ্রসর হবে। সেখানে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় শিল্পের চাহিদা মতো তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিষয়াদি নির্বাচন করে থাকে, যার সাথে ক্যারিয়ার পরামর্শ ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার যোগানও রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল এ বিষয়ে বলেছেন, এই অভিযানের মাধ্যমে নিয়োগকর্তা, ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান, মেয়র ও স্থানীয় পরিষদের সঙ্গে অংশীদারিত্বে এমন একটি শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যা তরুণদের নিজেদের অঞ্চলের চাকরি ও পেশাজীবনের সাথে আরও জোরালোভাবে যুক্ত করবে। তার মতামত, চলমান প্রযুক্তিগত বিপ্লব দেশের অর্থনীতির স্বার্থে নতুন প্রজন্মকে আরও দক্ষ করে তুলবে।

তবে এই সংস্কারের পক্ষে ও বিপক্ষে আছে বিভিন্ন মত। সাবেক মন্ত্রী অ্যালান মিলবার্ন সতর্ক করে বলেছিলেন, শিক্ষা ও কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণদের একটি অংশ 'হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে' পরিণত হওয়ার শঙ্কায় আছে। তিনি এই পরিকল্পনাকে সঠিক দিশায় একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দল কনজারভেটিভের শিক্ষাবিষয়ক মুখপাত্র লরা ট্রট মনে করেন, এই ঘোষণা বিদ্যমান সমস্যা মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট নয় এবং জ্ঞানকেন্দ্রিক শক্ত পাঠ্যক্রমের উপরেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের মুখপাত্র মুনিরা উইলসনের অভিমত, শিক্ষার্থীদের যাতে প্রয়োজনে একাডেমিক ও কারিগরি ধারার মধ্যে পরিবর্তনের সুযোগ থাকে, সেটি নিশ্চিত করা দরকার। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কারও ভবিষ্যৎ চুড়ান্ত করে দেওয়া অনুচিত।

অন্যদিকে, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হেড টিচার্স-এর মহাসচিব পল হোয়াইটম্যান জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষকরা এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, অর্থায়ন ও বিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে সরকারের আরও বিস্তারিত দিকনির্দেশনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।