উত্তরের সীমান্তবর্তী বাড়াই পাড়া গ্রামের রহমত (ছদ্মনাম) নামে এক সহকারী শিক্ষক শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নন। স্কুল ছুটির পর তিনি গ্রামের মাঠে শিশুদের খেলাধুলা দেখেন, প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেন, অসুস্থ শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে ওষুধ জোগান দেন। তার ঘরে সব সময় ওরস্যালাইন মজুত থাকে, যা গ্রামের লোকজন বিনা মূল্যে নিতে পারেন। কিন্তু এই আদর্শ শিক্ষকের নিজের সংসার চলে অত্যন্ত কষ্টে। প্রতি মাসে মুদি ও মাছের দোকানে বাকি জমতে থাকে। রহমত স্যার বলেন, ‘আমি সৎ পথে থাকতে চাই, কিন্তু বর্তমান বাজারদরে সৎ থেকে ভালো থাকা অসম্ভব।’ নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়লেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেডে আটকে আছে। মূল বেতন শুরু হয় মাত্র ১১ হাজার টাকায়। ফলে শিক্ষকদের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে, পাশাপাশি সমাজে শিক্ষকদের প্রতি সম্মানও তলানিতে ঠেকেছে।
সম্প্রতি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের পোশাক ও সাজগোজ নিয়ে ফেসবুকে কটাক্ষ করা হলে শিক্ষক সমাজের মানসিক কষ্ট সামনে আসে। এর প্রতিবাদে দেশের শিক্ষিকারা ফেসবুকে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশ করেন। এটি শুধু একটি গান ছিল না, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ। মাঠপর্যায়ে সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সৎ শিক্ষকরা ভালো নেই। প্রায় ১৪ বছর ধরে শিক্ষকতা করা এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘বেতনের টাকায় সংসার চলে না। পরিবারের প্রয়োজনে ধার করতে হয়, আর সেই ধার শোধ করতে নতুন ধার লাগে।’ এই সুযোগে গ্রামপর্যায়ে চড়া সুদের কারবার জমে উঠেছে। হাজার হাজার শিক্ষক বেতনের চেক বন্ধক রেখে ঋণ নিচ্ছেন, যার বড় অংশ মাসের শুরুতে সুদের কারবারির পকেটে চলে যায়।
সংকট শুধু বেতনে নয়, নিয়োগ ও প্রশাসনিক অরাজকতায়ও বড় ক্ষত রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের বড় অংশ মেধার ভিত্তিতে হলেও প্রতিটি নিয়োগে অনৈতিকভাবে কিছু লোক শিক্ষকতা পেশায় ঢোকে। কেন্দ্র কন্ট্রাক্ট বা প্রশ্ন সমাধানের মতো জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। এই অনৈতিক উপায়ে আসা শিক্ষকেরা নিয়মিত স্কুলে আসেন না; তারা স্থানীয় রাজনীতি, ব্যবসা বা কোচিং-বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকেন। তাদের অনুপস্থিতির বাড়তি চাপ সামলাতে হয় সৎ শিক্ষকদের। সাধারণ শিক্ষকদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এই নেটওয়ার্কের কাছে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা জিম্মি। দেশের মধ্যাঞ্চলের এক প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘অসৎ শিক্ষকেরা শিক্ষা অফিসারদের মাসোয়ারা দিয়ে পার পেয়ে যান, আর নিয়ম মানা শিক্ষক সামান্য ভুলেও শোকজ বা হয়রানির মুখে পড়েন।’ সাধারণ শিক্ষকদের বদলি, ছুটি, সার্ভিস বুক হালনাগাদ কিংবা পেনশন—প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুষের অলিখিত নিয়ম চালু। রংপুর বিভাগের এক শিক্ষক জানান, ঘুষ না দিলে সার্ভিস বুকে লাল কালি দেওয়ার ভয় দেখানো হয় অথবা ফাইল আটকে রাখা হয়।
এই অরাজক ব্যবস্থার প্রভাব সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়ছে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ২০২৩ অনুযায়ী, এক বছরে সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমেছে ১০ লাখের বেশি, বিপরীতে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে। অভিভাবকরা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার ওপর থেকে দ্রুত আস্থা হারাচ্ছেন। সাধারণ শিক্ষিকারা এবার ‘শ্রাবণ মেঘ’ গেয়ে সংহতি জানিয়েছেন, কিন্তু তারা জানেন শুধু গান দিয়ে সংকট কাটবে না। তাই সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড দেওয়া, পদোন্নতির ব্যবস্থা করা এবং নিয়োগের অনিয়ম ও শিক্ষা অফিসের ঘুষ-হয়রানি বন্ধ করার দাবি তাদের। উত্তরাঞ্চলের এক সহকারী শিক্ষকের কথা, ‘আমরা আন্দোলন করতে চাই না। শুধু সম্মান নিয়ে শান্তিতে বাচ্চাদের পড়াতে চাই। সরকার কি আমাদের এই সাধারণ চাওয়াটুকু পূরণ করবে?’




