একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কর্মজীবনের নিশ্চয়তা। কিন্তু বর্তমানে সেই ধারণা বদলে যাচ্ছে। সনদ হাতে পেলেও বহু তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। কেউ নিজের শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজ করছেন, কেউ আবার হতাশ হয়ে শ্রমবাজার ত্যাগ করছেন। অপর দিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও আধুনিক সেবাখাতের নিয়োগদাতারা বলছেন, প্রয়োজনীয় দক্ষতার মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষিত বেকার এবং দক্ষ কর্মীর সংকট—এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি থাকার অর্থ রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নের দর্শনে গভীর ত্রুটি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে। গত এক বছরে বেকারের সংখ্যা কয়েক লাখ বেড়েছে এবং শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারও কমেছে। শুধু কাজের সুযোগ সীমিত হচ্ছে না, বরং যারা কাজের আশাই ছেড়ে দিচ্ছে, তাদের সংখ্যাও বাড়ছে। বেকারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চশিক্ষিত তরুণ। যারা কাজ করছেন, তাদের অনেকেই এমন পেশায় নিয়োজিত যা তাদের শিক্ষা বা সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং জাতীয় সম্পদের অপচয়। একজন শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও বিপুল বিনিয়োগ থাকে। সেই বিনিয়োগ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত না হলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই সংকটের মূল কারণ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। শিক্ষাব্যবস্থা এখনো সনদকেন্দ্রিক—পরীক্ষায় ভালো ফলই যেন চূড়ান্ত লক্ষ্য। অথচ আধুনিক কর্মক্ষেত্র বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সামর্থ্য, যোগাযোগক্ষমতা ও দলগত কাজকে বেশি মূল্য দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মসংস্থানের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। দশ বছর আগে মানুষ যে কাজ করত, তার অনেকাংশ এখন যন্ত্র করছে। আবার যে ধরনের কাজের অস্তিত্ব কয়েক বছর আগে ছিল না, সেগুলোর জন্য দক্ষ মানুষের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে শিক্ষা এখন সারা জীবনের একটি প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা এখনো পুরোনো ধারণায় আটকে আছে। আমরা সন্তানকে জিজ্ঞাসা করি ‘কোন বিষয়ে পড়ছ?’ কিন্তু ‘কী শিখছ?’—সেটা খুব কমই জিজ্ঞাসা করি। সনদের সংখ্যা দিয়ে শিক্ষার সাফল্য পরিমাপ করা হয়, দক্ষতার মান দিয়ে নয়। ফলে ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু কর্মদক্ষতা একই গতিতে বাড়ছে না। এখানেই ‘ডিগ্রি ইনফ্লেশন’ নামক একটি নীরব সংকট কাজ করছে। একসময় যে চাকরির জন্য উচ্চমাধ্যমিক যথেষ্ট ছিল, এখন সেখানে স্নাতক ডিগ্রি চাওয়া হচ্ছে। আবার যেসব পদে স্নাতক যথেষ্ট ছিল, সেখানে স্নাতকোত্তর অলিখিত শর্ত হয়ে উঠছে। ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও বাজারমূল্য কমছে।
এই প্রবণতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় তরুণদের। তারা মনে করেন, আরও একটি ডিগ্রি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে নতুন ডিগ্রি যোগ হয়, নতুন দক্ষতা যোগ হয় না। ফলে কর্মসংস্থানের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, হতাশা বাড়ে। বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মানুষ। বিশ্বের বহু দেশ জনসংখ্যার বার্ধক্যের কারণে শ্রমশক্তির সংকটে পড়ছে। বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছায়নি। আমাদের হাতে বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তরের একটি বিরল সুযোগ আছে। কিন্তু এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। জনমিতিক সুবিধারও একটি সময়সীমা থাকে।
এখন প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষা দেশের অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করছে। একটি ডিগ্রি কি একজন তরুণকে কাজের জন্য প্রস্তুত করছে, নাকি তাকে আরেকটি সনদের মালিক বানাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সমস্যাটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার বা কর্মসংস্থানের নয়—এটি শিক্ষা, অর্থনীতি, শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়ের সংকট। যে রাষ্ট্র আগে বুঝতে পারে আগামী ১০ বছরে তার কী ধরনের জনশক্তি লাগবে, সে রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর নতুন স্নাতক তৈরি করছে, কিন্তু শিল্প ও সেবা খাত সব সময় সেই দক্ষতা খুঁজে পাচ্ছে না। আবার অনেক খাতে কর্মীর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত মানুষ মিলছে না।
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত রূপান্তর। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে উঠে দাঁড়িয়েছে। সিঙ্গাপুর প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতাকে দক্ষতা ও প্রযুক্তির শক্তিতে পরিণত করেছে। জার্মানি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একই সেতুবন্ধনে যুক্ত করেছে। ভিয়েতনাম বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলে প্রবেশের আগে শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের সাফল্যের রহস্য একটি সহজ উপলব্ধি—ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হবে মানুষের মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে।
প্রথমত, শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কী পড়াবে, তা শুধু একাডেমিক আলোচনায় নির্ধারিত হলে চলবে না; শিল্প, প্রযুক্তি ও শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদাও সেখানে প্রতিফলিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে। বাংলাদেশে অনেক পরিবার এখনো মনে করে, কারিগরি শিক্ষা যেন উচ্চশিক্ষায় ব্যর্থদের বিকল্প। এই ধারণা অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। একটি আধুনিক শিল্পরাষ্ট্র দক্ষ প্রকৌশলী যেমন চায়, তেমনি দক্ষ টেকনিশিয়ান, মেশিন অপারেটর, স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞও চায়। তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগকে অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে আনতে হবে। সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো ছাড়া এই খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না। চতুর্থত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি আমদানি করে কিছু দূর এগোনো যায়, কিন্তু স্থায়ী অগ্রগতি আসে নিজস্ব উদ্ভাবন থেকে। উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে উত্তরণের জন্য এই বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গেও সতর্ক হতে হবে। এটি কিছু পেশাকে বদলে দেবে, কিছু কাজ বিলুপ্ত করবে, কিন্তু একই সঙ্গে অসংখ্য নতুন পেশার জন্ম দেবে। প্রযুক্তিকে প্রতিরোধ না করে তার সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করাই বিচক্ষণতার পরিচয়। তবে এসব পরিবর্তনের জন্য একটি মৌলিক মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সমাজে এখনো প্রশ্ন করা হয়, ‘ছেলেটি কোথায় চাকরি পেল?’ খুব কম মানুষ জিজ্ঞাসা করেন, ‘সে কী তৈরি করছে?’ বা ‘কতজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে?’ রাষ্ট্রের সাফল্যের পরিমাপও বদলাতে হবে। কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো বা কতজন স্নাতক বের হলো—এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও যথেষ্ট নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন শিক্ষার্থী কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হলো এবং কতজন নিজের দক্ষতা দিয়ে নতুন মূল্য সৃষ্টি করল।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। এখন আর প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, আরও কতজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া যাবে। প্রশ্ন হওয়া উচিত, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া প্রত্যেক তরুণকে আমরা কতটা কর্মদক্ষ, উদ্ভাবনী ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি। একটি ডিগ্রি একজন মানুষের পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। যেদিন একটি ডিগ্রির চেয়ে একটি দক্ষতা বেশি মূল্য পাবে, সেদিনই বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় সত্যিকার অর্থে শুরু হবে।



