ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এক নয়, ফলে নির্দিষ্ট অবস্থানে দাঁড়িয়ে একজন ব্যক্তির ওজনেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই তারতম্যের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির বিজ্ঞানীরা সম্মিলিতভাবে একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। ২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত 'গ্রেস' (Gravity Recovery and Climate Experiment) নামক এই যৌথ কৃত্রিম উপগ্রহ মিশনের আওতায় দুটি স্যাটেলাইট পরস্পরকে অনুসরণ করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে। তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই এই পরিমাপ সম্পন্ন হয়েছে।
স্যাটেলাইট দুটি যখন কোনো তীব্র মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রের উপর দিয়ে অতিক্রম করত, তখন সামনের স্যাটেলাইটটি সামান্য বেশি বেগপ্রাপ্ত হতো। দূরত্বের এই মাইক্রোস্কোপিক ওঠানামা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা পৃথিবীর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ অভিকর্ষ মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই মানচিত্রে ধরা পড়েছে, ভারতের সমুদ্রউপকূল থেকে খুব দূরের একটি অঞ্চলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বিপরীতে, দক্ষিণ আমেরিকার চিলির পার্বত্য এলাকায় এই শক্তির পরিমাপ বেশি।
গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হলো ইন্ডিয়ান ওশান জিওয়েড লো (IOGL), যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাকর্ষীয় ব্যতিক্রম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই রহস্যঘেরা ভৌগোলিক স্থানটির কেন্দ্রস্থল শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাংশে, যা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে আনুমানিক ২,৪০০ থেকে ২,৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিম দিকেল অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা এটিকে প্রায়শই 'মাধ্যাকর্ষণ গর্ত' বা 'গ্র্যাভিটি হোল' বলে অভিহিত করেন। প্রায় ৩০ লাখ বর্গকিলোমিটার (প্রায় ১২ লাখ বর্গমাইল) জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে স্থানীয় মহাকর্ষ বল অত্যন্ত দুর্বল হওয়ার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে সেখানকার সাগরপৃষ্ঠ বৈশ্বিক গড় স্তরের থেকে প্রায় ১০৬ মিটার বা ৩৪৮ ফুট নিচে অবনমিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা এও ব্যাখ্যা করেছেন যে পৃথিবীর স্থলভাগের পাহাড়-পর্বত বা মহাসাগরীয় অরচানাগুলির সাথে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির এই তারতম্যের সরাসরি কোনো সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং গ্রহের গভীর অভ্যান্তরে ভর কেমন ভাবে বিন্যস্ত, তার ওপরেই এই শক্তি মূলত নির্ভর করে। ভূপৃষ্ঠের হাজার হাজার কিলোমিটার গভীরে প্রাগৈতিহাসিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলোই এই অসঙ্গতির জন্য দায়ী। পৃথিবীর ম্যান্টল বা গুরুমণ্ডল স্তরটি অভিন্নভাবে মিশ্রিত নয়; বরং এতে অধিক ও কম ঘনত্বের শিলার বিচ্ছিন্ন অঞ্চল রয়েছে। এই ভরের পার্থক্যই অভিকর্ষীয় বলে সূক্ষ্ম তারতম্য তৈরি করে।
তবে এই প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন ওজনের হিসাবে প্রায় ধরা পড়েই না। এই গভীর প্রভাবের সবচেয়ে সুস্পষ্ট নমুনা রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের নিচে। এখানে পৃথিবীর অন্যতম দুর্বলতম একটি মাধ্যাকর্ষণ বলয় বিদ্যমান, যাকে 'অ্যান্টার্কটিক জিওভিড লো' নামে আখ্যা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ফোর্টের নেতৃত্বাধীন এক গবেষণায় উঠে আসে, এই মহাকর্ষণীয় অসঙ্গতি মূলত ৩ থেকে ৫ কোটি বছর আগে তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল অ্যান্টার্কটিকার তলায় চলমান ধীরগতির ম্যান্টলীয় প্রক্রিয়াগুলো। ওই এলাকায় যদি কোনো ব্যক্তির ওজন ৯০ কিলোগ্রামও হয়, তবুও অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে তার ওজন মাত্র ৫ থেকে ৬ গ্রাম কম প্রদর্শিত হবে।




