প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই যুগে তরুণ প্রজন্মের কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কারও মতে তা বিশাল সুযোগের দোর খুলে দিচ্ছে, আবার কারও দৃষ্টিতে ভবিষ্যদ্বাণী করছে এক বিষণ্ণ সম্ভাবনা। এআইয়ের প্রসার ও দূরবর্তী কর্মব্যবস্থার কারণে কর্পোরেট জগতে সদ্যস্নাতকদের জন্য প্রচলিত পদগুলো শুকিয়ে আসছে। একইসাথে, এআই পরিকাঠামো নির্মাণের প্রতিযোগিতায় দক্ষ টেকনিশিয়ানের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে আরও কয়েকটি পরস্পরবিরোধী ধারা। বেবি বুমার প্রজন্মের ব্যাপকহারে অবসরে যাওয়ার ফলে শূন্য পদ বাড়লেও, বিগত কয়েক দশকের নিম্ন জন্মহার তরুণ কর্মীর অভাব প্রকট করে তুলেছে। লাইটকাস্টের পূর্বাভাষ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জনসংখ্যার এই খরায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগকর্তারা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ শ্রমঘাটতির মুখোমুখি হবেন। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন এডুকেশন অ্যান্ড দ্য ওয়ার্কফোর্স অনুমান করছে, ২০৩২ সালের মধ্যে ৫২.৫ লাখ উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন হবে, অন্যথায় ১৭১টি পেশায় দক্ষতার অভাব দেখা দেবে। অন্যদিকে, এআইয়ের সহজলভ্যতা কম খরচে ব্যবসা শুরু করাকে সহজ করে তুলেছে, যা ‘এক-ব্যক্তি উদ্যোক্তা’র ধারণাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজেয়ারর্বিদ ইয়ার্দেনি জুন মাসে এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, পেশাদার ও ব্যবসায়িক পরিষেবা খাতে চাহিদার ঊর্ধ্বগতি এআই গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ প্রতিভার চাহিদাকে ইঙ্গিত করে। তাঁর মতে, নয়জন বা ততোধিক কর্মীওয়ালা প্রতিষ্ঠানগুলোরই চাকরির সুযোগ সবচেয়ে বেশি, যার কারণ এআই সরঞ্জামের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হওয়ার ব্যয় ও জটিলতা কমে যাওয়া। তবে চাহিদা বাড়লেও প্রকৃত নিয়োগ ছিল হতাশাজনকভাবে ম্লান। ইয়ার্দেনি ব্যাখ্যা করেন, “এর কারণ এআই যে অতি-বিশেষায়িত চাকরি তৈরি করছে, সেখানে প্রতিভার অভাব রয়েছে।” এর ফলেই দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বও বাড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রযুক্তি খাতে স্পষ্ট এআই দক্ষতাযুক্ত পোস্টিং জুনে ৭৫% পৌঁছেছে, যা মার্চের ৬৭% এবং বছর ব্যবধানে ১৭৮% বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে। ডাইসের তথ্যমতে, এজেন্টিক এআই, দায়িত্বশীল এআই ও এআই পরিকাঠামোর মতো খাতে দক্ষতা দ্রুততম গতিতে বাড়ছে। ইয়ার্দেনির ভাষায়, “এআই কাঠামোগত দক্ষতার অসামঞ্জস্য তৈরি করছে যেখানে কোম্পানিগুলো সাধারণ দক্ষতাধারীদের বদলে বিশেষজ্ঞদের আগ্রাসীভাবে প্রতিস্থাপন করছে।” তিনি জেভনস প্যারাডক্সে বিশ্বাস করেন, অর্থাৎ এআই কাজকে দক্ষ করলেও এর ব্যবহার-খরচ কমে গিয়ে মোট চাহিদা এতটাই বাড়ায় যে শেষ পর্যন্ত এটাই কর্মসংস্থানের একটি নীট স্রষ্টা।
এক ভিন্ন মত দিয়েছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও এমআইটি অধ্যাপক সাইম জনসন। ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের দুই কন্যাকে উদাহরণ হিসাবে টেনে এনে বর্তমান যুবসমাজের সামনে থাকা দুটি পেশাজীবনের পথের কথা বলেছেন। এক কন্যার আগ্রহ ল্যাব বিজ্ঞানে, যা মানুষের বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন এবং এআই দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্য মেয়েটি একজন ‘জেনারেলিস্ট’। জন্সন বললেন, নতুন কোনো সর্ব-উদ্দেশ্যে প্রযুক্তির (যেমন এআই) উদ্ভাবনের জন্য দরকার ‘জেনারেল-পারপাস নার্ড’।
তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, “জেনারেল-পারপাস নার্ড হলো সেই ব্যক্তি যে সপ্তাহান্তে সর্বশেষ এআই আয়ত্ত করতে পারে। সোম ও মঙ্গলবার সরাসরি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে নতুন জিনিস শেখে। বুধবার একটি ৫০ বছরের পুরনো বই পড়ে তা থেকে অর্থ উদ্ধার করে এবং কীভাবে তা ব্যবহার করা যাবে তা ঠিক করে। বৃহস্পতিবার একটি পডকাস্ট চালাতে পারে। আর শুক্রবার মন্ত্রীর জন্য এক পৃষ্ঠার মেমো প্রস্তুত করে।” তিনি উদাহরণ দিয়ে বললেন, কেবল ব্রাজিলের স্টক মার্কেটের তথ্য খোঁজার কাজটি এআই সহজেই করে দিতে পারে, কিন্তু যে সহকারী তথ্য সংযোজন করতে, জটিলতা সমাধান করতে এবং দ্রুত নেতৃত্বের কাছে সমাধান নিয়ে যেতে পারবেন, তিনি হয়ে উঠবেন ‘বেশ আকর্ষণীয়’। নির্বাহীদের জন্য জন্সনের পরামর্শ, এআই প্রযুক্তির চাপে দিশেহারা হলে তারা যেন এমন একজন ‘জেনারেল-পারপাস নার্ড’ নিয়োগ করেন, যিনি শিক্ষাক্ষেত্রের বাইরেও একজন জেনারেলিস্ট।
জনসন আরও বক্তব্য দেন, “আমার মনে হয়, জীবন-অভিজ্ঞতা অর্জন করা, ভাষা শেখা, ভ্রমণ করা, মানুষকে বোঝা, সরাসরি কথা বলার ও শোনার ক্ষমতা—এসব যারা একত্র করতে পারবে, তারাই হবে অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ কিছুতে বাজি ধরতে গেলে আপনাকে ভাবতে হবে ওই ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রবেশ কেমন হবে।” এই প্রতিবেদনটি মূলত ফরচুন ডটকমে প্রকাশিত।




