ইসলামের ইতিহাসে হিজরত একটি স্মরণীয় অধ্যায়। এটি কেবল একটি শহর থেকে অন্যটিতে স্থানান্তর ছিল না, বরং নির্যাতিত একটি সম্প্রদায়কে সংগঠিত রাষ্ট্রীয় শক্তিতে পরিণত করার পথচলার সূচনা। নবুওয়তের ত্রয়োদশ বছরে মক্কার কুরাইশ নেতারা দারুন-নাদওয়ায় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন। সেই সংকটময় মুহূর্তে মক্কা ছেড়ে মদিনায় (তৎকালীন ইয়াসরিব) হিজরতের নির্দেশ আসে। প্রশ্ন থেকে যায়—আরবের অসংখ্য অঞ্চল, গোত্র ও শহর থাকা সত্ত্বেও কেন মদিনাকেই বেছে নেওয়া হলো? এর উত্তর একক কোনো কারণে নয়, বরং একাধিক বাস্তব, যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট একসঙ্গে মদিনাকে এই ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করেছিল।
সবচেয়ে সরাসরি কারণ হলো, হিজরতের আগেই মদিনায় একটি উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। নবুওয়তের একাদশ বছরে ছয়জন মদিনাবাসীর সঙ্গে নবীজির প্রথম সাক্ষাৎ হয়। পরের বছর হজের সময় বারোজন মদিনাবাসী প্রথম আকাবার শপথ (বাইয়াতুল আকাবা) গ্রহণ করেন। নবীজি তাঁদের সঙ্গে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে দাওয়াতের কাজে পাঠান। মুসআবের প্রচেষ্টায় এক বছরের মধ্যেই মদিনায় ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে পরবর্তী হজ মৌসুমে প্রায় পঁচাত্তরজন মদিনাবাসী দ্বিতীয় আকাবার শপথে অংশ নেন এবং নবীজিকে সশরীরে রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ)। অর্থাৎ, হিজরতের আগেই মদিনায় একটি প্রস্তুত সহায়ক জনগোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল, যা অন্য কোনো শহরে ছিল না।
দ্বিতীয়ত, মদিনার দুই প্রধান আরব গোত্র আওস ও খাজরাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরস্পরের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত ছিল। এই বিরোধের চূড়ান্ত রূপ ছিল বুআসের যুদ্ধ, যা হিজরতের কিছুকাল আগে সংঘটিত হয় এবং উভয় গোত্রকে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত করে তোলে। এই যুদ্ধক্লান্ত পরিস্থিতিতে মদিনার মানুষ এমন একজন নিরপেক্ষ, বহিরাগত কিন্তু বিশ্বস্ত নেতা খুঁজছিল, যিনি তাদের পুরোনো শত্রুতা ভুলিয়ে দিতে পারবেন। নবীজির প্রতি মদিনাবাসীর দ্রুত সাড়া দেওয়ার পেছনে এই সামাজিক প্রয়োজনীয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।
তৃতীয়ত, মদিনা ছিল একটি বহুত্ববাদী সমাজ। মক্কা ছিল একক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর শহর, যেখানে কুরাইশদের পৌত্তলিক বিশ্বাস ও বাণিজ্যিক আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। নতুন কোনো আদর্শের বিকাশ সেখানে ছিল অত্যন্ত কঠিন। অন্যদিকে, মদিনায় বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করত। এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশ একটি নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী ছিল।
চতুর্থত, ভৌগোলিক ও কৃষিভিত্তিক সুবিধা মদিনাকে আলাদা করে তুলেছিল। মদিনা ছিল একটি উর্বর মরূদ্যান, যেখানে খেজুরবাগান ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি একটি নতুন জনগোষ্ঠীকে খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা রাখত। মক্কার শুষ্ক, বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে এই সুযোগ ছিল না। এছাড়া মক্কা থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার দূরত্ব কুরাইশদের সরাসরি সামরিক নাগালের বাইরে একটি প্রাথমিক সুরক্ষা দিয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশরা মদিনা পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
পঞ্চমত, মদিনায় বসবাসরত ইহুদি গোত্রগুলোর (বানু কাইনুকা, বানু নাজির, বানু কুরাইজা) সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক ছিল জটিল এবং সময়ের সঙ্গে তা বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে। প্রথমদিকে মদিনা সনদের মাধ্যমে পারস্পরিক সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রূপ নেয়। এই সম্পর্ক পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন মুসলিম উম্মাহ শিখেছিল কীভাবে ভিন্নধর্মী প্রতিবেশীর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক গড়তে ও রক্ষা করতে হয়। এটি এমন একটি দক্ষতা, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিস্তৃত ইসলামি সাম্রাজ্যে বহুধর্মীয় জনগোষ্ঠী শাসনের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মদিনায় মুসলিমরা আরেকটি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে মুনাফিকদের মোকাবিলায়। মক্কায় শত্রু ছিল প্রকাশ্য, কিন্তু মদিনায় মুখে ইসলামের দাবিদার অথচ ভেতরে ভেতরে বিরোধিতাকারী একদল মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। এই অভিজ্ঞতা মুসলিম নেতৃত্বকে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ধৈর্যের নতুন শিক্ষা দিয়েছিল।
সবমিলিয়ে, হিজরতের জন্য মদিনা নির্বাচন কোনো একক কারণে ঘটেনি। এটি ছিল একাধিক বাস্তব সামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উপাদানের সমন্বয়। আগে থেকে তৈরি হওয়া বিশ্বাসীদের দল, আওস-খাজরাজের নিরপেক্ষ নেতৃত্বের তাগিদ, বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামো এবং কৃষিভিত্তিক ভৌগোলিক সুবিধা—এই সবকিছু একসঙ্গে মিলেই মদিনাকে একটি নতুন ইসলামি রাষ্ট্রের সূতিকাগার হয়ে ওঠার পথ প্রশস্ত করেছিল।



