ইসলামি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস সফর বর্তমানে চলছে। আরবি ভাষায় ‘সফর’ শব্দের অর্থ ‘শূন্য’ বা ‘রিক্ততা’। এই নামকরণের পেছনে প্রাচীন আরবের একটি রীতি রয়েছে; কারণ সে সময় আরবরা খাদ্যের সন্ধানে বসতি ছেড়ে মরুভূমিতে চলে যেত, ফলে জনপদগুলো ফাঁকা হয়ে পড়ত। কিন্তু এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থেকে পরবর্তীকালে এক ভিত্তিহীন ধারণার জন্ম হয়—সফর মাসকে ‘অশুভ’ বা ‘অমঙ্গলজনক’ বলে মনে করা শুরু হয়, যা ইসলাম আবির্ভাবের পরেও সমাজের গভীরে টিকে ছিল।জাহেলি যুগের আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল একাধিক কুসংস্কার। তাদের বিশ্বাস ছিল, সফর মাসে বিপদ-আপদ বেশি ঘটে। এমনকি কারও কারও অভিমত ছিল, সফর একটি সাপ যা মানুষের পেটে বাস করে এবং ক্ষুধার্ত হলে যন্ত্রণা দেয়। এই সব অমূলক বিশ্বাসকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো আদওয়া (সংক্রামক ব্যাধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়ানো) নেই, কোনো পাখির অশুভ লক্ষণ (তিয়ারাহ) নেই, কোনো হামাহ (নিহতের আত্মা থেকে সৃষ্ট পাখি) নেই, এবং সফর মাসেও কোনো অশুভত্ব নেই’। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭০৭) এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কিছুই ঘটে না এবং এসব বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।অন্যদিকে, ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, সফর মাস ইসলামের ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী। এর মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য হলো মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের প্রস্তুতি। ২৭ সফর মহানবী (সা.) আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মক্কার ঘর ত্যাগ করেন এবং সাওর গুহায় আশ্রয় নেন। তিন দিন সেখানে অবস্থানের পর তারা মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ) উল্লেখ্য, আমরা হিজরতের বছর মহররম মাস দিয়ে গণনা শুরু করলেও প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়েছিল সফরের শেষ প্রান্তে।সপ্তম হিজরির সফর মাসে সংঘটিত হয় খাইবার বিজয়। এই অভিযানের মাধ্যমে ইহুদি অধ্যুষিত খাইবার দুর্গ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে, যা মদিনার রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে। (আত-তাবারি, তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক) দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসেই মহানবী (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর সঙ্গে আলী (রা.)-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া) এই বিয়ের মাধ্যমেই পরবর্তীকালে হাসান ও হোসাইন (রা.)-এর জন্ম, যাঁরা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।একাদশ হিজরির সফর মাসে মহানবী (সা.) রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানের উদ্দেশ্যে ওসামা ইবনে জায়েদের নেতৃত্বে একটি সেনাদল গঠন করেন, যা তাঁর জীবনের শেষ সামরিক নির্দেশনাগুলোর একটি। (ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ) তবে এই বাহিনী রওনা হওয়ার আগেই তাঁর অসুস্থতা শুরু হয়; অনেক বর্ণনা অনুযায়ী এই অসুস্থতার সূত্রপাতও সফর মাসের শেষ দিকে, যা পরবর্তী মাস রবিউল আউয়ালে তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত গড়ায়। (ইবনে কাসির) অন্যদিকে, নবীজির দৌহিত্র ইমাম হাসান (রা.) ৫০ হিজরির ২৮ সফর বিষপ্রয়োগে শাহাদাত বরণ করেন, যা কারবালার ট্র্যাজেডির প্রায় এগারো বছর আগের ঘটনা। এভাবে সফর মাস ইসলামি ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।