শহুরে ও প্রবাসী মুসলিম পরিবারগুলোতে সন্তানদের পবিত্র কোরআন শেখানোর জন্য অনলাইন মাধ্যমে শিক্ষাদান এখন একটি সাধারণ পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। জুম, স্কাইপ বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ঘরে বসেই দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে তাজবীদের সঙ্গে কোরআন শেখার এই ব্যবস্থা সময় ও অর্থ দুইয়েরই সাশ্রয় করছে। তবে এই সুবিধাজনক ব্যবস্থার উল্টো দিকেও রয়েছে গুরুতর নিরাপত্তা সংকট, যা বেশিরভাগ অভিভাবকই উপলব্ধি করতে পারেন না। স্ক্রিনের ওপারে থাকা শিক্ষক যে সবসময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারেন, সেটি একটি কঠিন বাস্তবতা যা সমাজে স্বীকার করতে অনীহা রয়েছে। অনলাইন ক্লাসের নামে শিশুদের সাইবার গ্রুমিং, মানসিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই প্রত্যেক অভিভাবকের জন্য এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে সন্তানকে যেকোনো ছদ্মবেশী শিকারির হাত থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নেওয়া।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, সন্তান আল্লাহর দেওয়া এক আমানত। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা এবং হাদিসে রাসুল (সা.)-এর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নিরাপত্তা ও নৈতিকতার দায়িত্ব পিতামাতার ওপর বর্তায়। সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবেই অনলাইন ক্লাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু কঠোর নীতিমালা মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
প্রথম শর্ত হলো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সব ধরনের যোগাযোগ অভিভাবকের পর্যবেক্ষণে রাখা। শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত চ্যাট, ইমেইল বা সামাজিক যোগাযোগের আইডি ব্যবহারের অনুমতি শিশুকে দেওয়া যাবে না। পড়া সংক্রান্ত অডিও বা ভিডিও আদান-প্রদানের প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই অভিভাবকের নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশুকে শেখাতে হবে যেন সে তার ব্যক্তিগত তথ্য যেমন স্কুলের নাম, ঠিকানা বা পরিবারের রুটিন কোনো অবস্থাতেই শিক্ষকের কাছে প্রকাশ না করে। অপরাধীরা এই তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ব্ল্যাকমেইল বা শারীরিক ক্ষতির পরিকল্পনা করতে পারে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনলাইন ক্লাস কখনোই বদ্ধ ঘরে একা একা নেওয়া যাবে না। বসার ঘর বা ডাইনিং স্পেসের মতো উন্মুক্ত স্থানে ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে পরিবারের অন্য সদস্যরা নিয়মই চলাচল করেন এবং শিক্ষকের কার্যকলাপ ও কথা বলা দূর থেকেও পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। ইসলামে নারী-পুরুষের নির্জনে মেলামেশাকে ‘খালওয়াহ’ বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ক্যামেরার ওপারে একা থাকাকেও এক ধরনের ‘ডিজিটাল নির্জনতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো শিক্ষক যদি অভিভাবকের উপস্থিতিতে আপত্তি জানান, তাহলে তা বিপদের ইঙ্গিত বলে মনে করা উচিত।
চতুর্থ নিয়ম হিসেবে বলা হয়েছে, ক্লাস চলাকালে শিক্ষক কোনো সেশন রেকর্ড করতে পারবেন না এবং শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও শিক্ষকের কাছে পাঠানো যাবে না। পুরস্কার বা পড়া আদায়ের অজুহাতে এমন অনুরোধ এলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। পঞ্চমত, শিশুকে শারীরিক সীমানা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। কেবল তার মুখমণ্ডল ও হাত স্ক্রিনে দৃশ্যমান থাকবে, শরীরের অন্য কোনো অংশ দেখানোর অনুরোধ এলে সঙ্গে সঙ্গেই ‘না’ জানিয়ে কল বন্ধ করার স্বাধীনতা তাকে দিতে হবে। শিক্ষকও যেন শালীন পোশাকে থাকেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, অনলাইন ক্লাস শুরুর আগেই অভিভাবকের পক্ষ থেকে এই শর্তগুলো শিক্ষককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত। কোনো ছদ্মবেশী অপরাধী এতে সতর্ক হয়ে অন্য ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি শিশুর পড়া শুদ্ধ করার চেয়ে তার মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক নিরাপত্তা রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবহেলার কারণে কোনো ক্ষতি ঘটলে তা সন্তানের সারাজীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং ধর্মের প্রতিও তার মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।




