ব্যক্তিগত কাজের চাপে মাছ শিকারে দীর্ঘ বিরতি পড়ে গিয়েছিল সুপ্রিয় রায়ের। দীর্ঘদিনের বন্ধু ওমর হায়দার বারবার তাগিদ দিচ্ছিলেন—কোথাও গিয়ে মাছ ধরা হোক। দেশে নানা স্থানে শিকার করেছেন তারা, কিন্তু এখন শখের এই কাজটি অনেকটা বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। তাই দেশীয় খরচের তুলনায় বিদেশে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেন দুজনে। থাইল্যান্ডে মাছ ধরার জন্য উপযুক্ত অনেক স্থান রয়েছে; খোঁজখবর নিয়ে তারা বেছে নিলেন ৪২ বছরের পুরোনো বুং সামরান ফিশিং পার্ক।
৫ আগস্ট দুজনে ব্যাংককে পৌঁছান। রাত কাটিয়ে পরদিন গাড়িতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পথ পেরিয়ে পার্কে হাজির হন। নিবন্ধনের পর তাদের একটি বাংলোয় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সঙ্গে দেওয়া হয় একজন গাইড। প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ফিশিং ছিপ, হুইল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, গাইড ও থাকার সুবিধা। প্রতিদিনের খরচ ৫ থেকে ৭ হাজার বাথ। দুজনে একটি ছিপ নিয়েছিলেন, যার মূল্য ৬ হাজার বাথ—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২২ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিদিনের অনুমতিপত্রের জন্য জনপ্রতি ২ হাজার বাথ, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
বুং সামরান প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার বর্গমিটার আয়তনের একটি হ্রদ। এখানে ৪০টির বেশি প্রজাতির মাছ রয়েছে। মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশের ওজন ২০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে; জায়ান্ট সিয়ামিজ কার্পের ওজন ১০০ কেজি ছাড়িয়ে যায়। বাংলোয় ওঠার পর সহকারী কর্মী টোপ তৈরির কাজে নামেন। প্রায় ৩০ কেজি খাবার দিয়ে টোপ প্রস্তুত করা হয়—কেবল চালের গুঁড়া ও ছাতুসহ বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে, কোনো রাসায়নিক ছাড়াই।
ছিপ ফেলার মিনিট পনেরোর মধ্যেই প্রথম টান আসে। ওমর হায়দারের হাতে তখন ছিপ; বোঝা যাচ্ছিল, বড় কিছু ধরা পড়েছে। টোপ খাওয়ার পর ছিপের সুতা কিছুটা ছেড়ে দিতে হয়, আবার মাছের টান বুঝে ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনতে হয়—পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা ঘুড়ি ওড়ানোর মতো। প্রায় ২০ মিনিটের লড়াইয়ের পর মাছটি ক্লান্ত হয়ে কাছে আসে। নেটের সাহায্যে তিনজনে মিলে আলতো করে বাংলোর পাটাতনে তোলা হয়। মুখ থেকে বড়শি খুলে ফেলা হয়। তাদের ব্যবহৃত বড়শির বিশেষত্ব হলো, অগ্রভাগে বার্ব বা উল্টোমুখী ফলা নেই—ফলে মাছ গিলে ফেললেও সহজে খুলে যায় এবং ক্ষতি কম হয়। ওজন মেপে দেখা যায়, প্রথমবারেই ৩৬ কেজির একটি মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশ ধরা পড়েছে। ছবি তোলার পর নিয়ম মেনে তাৎক্ষণিকভাবে পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এখানে ‘ক্যাচ অ্যান্ড রিলিজ’ নীতিই প্রচলিত—ধরবেন, ছবি তুলবেন, তারপর ছেড়ে দেবেন। মাছের প্রতি যত্নশীলতা অত্যন্ত গুরুত্ব পায়। শরীরে কোনো আঘাত লাগলে বা মাছ মারা গেলে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়।
প্রথম সাফল্যের পর প্রস্তুতি নিতে কিছুটা সময় লাগে। ১২ মিনিট পর আবার হিট; এবার সুপ্রিয় রায়ের হাতে প্রায় ৫০ কেজির মাছ। দুজনে ছবি তুলে সেটিকেও ছেড়ে দেন। ভরদুপুরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। ততক্ষণে তারা প্রায় ২২ থেকে ২৩টি বড় মাছ এবং অনেক ছোট মাছ ধরে ফেলেছেন। কিন্তু শরীরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে—দুই হাতসহ পুরো দেহে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। বড় মাছের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের চাপ সেদিন ভালোভাবেই অনুভূত হয়।
তবে দিনের সবচেয়ে বড় চমক তখনো বাকি ছিল। শেষ দিকে সুপ্রিয় ৭৬ কেজি ওজনের একটি মাছ পান। এটিও ছিল মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশ। এত বড় মাছ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। এত কাছ থেকে দেখা ও ছবি তোলার অভিজ্ঞতা তার মতে সত্যিই অসাধারণ।
পার্কে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০ কেজি ওজনের মাছ ধরার রেকর্ড রয়েছে। ১০০ কেজির বেশি ওজনের মাছ ধরতে পারলে হল অব ফেমে স্থান পাওয়া যায়। দুজনের ইচ্ছা ছিল অন্তত ১০০ কেজির একটি মাছ ধরা, কিন্তু এবার তা সম্ভব হয়নি। শখের মাছশিকারিদের একটি গ্রুপে তারা এই সফরের কথা শেয়ার করেছেন; অনেকে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সুপ্রিয় রায়ের নিজেরও আবার যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে—হল অব ফেমে নিজেদের ছবি তুলতেই হবে বলে জানালেন তিনি।




