মুখের দুর্গন্ধ, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে হ্যালিটোসিস নামে পরিচিত, কেবল সামাজিক অস্বস্তিই তৈরি করে না; ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে। অনেকে নিয়মিত দাঁতের ব্রাশ ব্যবহার করেন এবং মুখ পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করেন, তবু নিঃশ্বাসের গন্ধ দূর হয় না। অনেক সময় এই সমস্যার কারণে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়; সঙ্গী কাছে আসতে দ্বিধা বোধ করতে পারেন। এই পরিস্থিতির পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে একাধিক শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ।
প্রথমত, জিভের পৃষ্ঠ—বিশেষ করে পেছনের অংশ—অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। খাবারের অবশিষ্টাংশ ভেঙে এসব জীবাণু সালফারযুক্ত যৌগ উৎপন্ন করে, যা তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। কেবল দাঁত মাজলে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো দূর হয় না; তাই জিভ পরিষ্কার করা অত্যন্ত আবশ্যক।
দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সাধারণ ব্রাশ অনেক সময় এসব সংকীর্ণ স্থানে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে না। সেখানে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে গন্ধ তৈরি করে। এজন্য প্রতিদিন ফ্লস বা দাঁতের ফাঁকের বিশেষ ব্রাশ ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
মাড়ির সংক্রমণ—যেমন জিঞ্জিভাইটিস বা পেরিওডোন্টাইটিস—অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। মাড়ি থেকে পুঁজ বা রক্তপাতের সঙ্গে তীব্র দুর্গন্ধও দেখা দিতে পারে। এই অবস্থার গুরুত্ব না দিলে সমস্যা ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
মুখ শুকিয়ে যাওয়া আরেকটি সাধারণ কারণ। লালা স্বাভাবিকভাবে মুখ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা, অপর্যাপ্ত পানি পান, কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনের ফলে লালার প্রবাহ কমে গেলে দুর্গন্ধ বৃদ্ধি পায়। রোজার সময়েও এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় হতে পারে।
গলার টনসিলে ছোট সাদা দানার মতো টনসিল স্টোন জমে বাজে গন্ধ নির্গত হতে পারে। অন্যদিকে, রসুন, পেঁয়াজ ও মশলাদার খাবার খাওয়ার পর গন্ধ কেবল মুখে সীমাবদ্ধ থাকে না; রক্তের মাধ্যমে ফুসফুসে পৌঁছে নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হয়ে আসে। তাই দাঁত মাজলেও কিছু সময় পর্যন্ত গন্ধ থেকে যেতে পারে।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য মুখ শুষ্ক করে এবং স্থায়ী দুর্গন্ধের জন্ম দেয়। এ ছাড়া পাকস্থলীর অ্যাসিড রিফ্লাক্স, ডায়াবেটিস, সাইনাস সংক্রমণ বা লিভারের সমস্যাও মুখের গন্ধের নেপথ্য কারণ হতে পারে। লিভারের অসুস্থতার সঙ্গেও এই সমস্যা সম্পর্কিত হতে পারে।
সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হলে দাঁতের চিকিৎসক বা সাধারণ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দৈনন্দিন যত্নে দিনে অন্তত দুবার দাঁত মাজা ও জিভ পরিষ্কার রাখা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, অ্যালকোহল-মুক্ত মুখ ধোয়ার দ্রবণ ব্যবহার এবং ধূমপান পরিহার করাও কার্যকর পদক্ষেপ। ফ্লস প্রতিদিন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুললে দাঁতের ফাঁকে জমা খাদ্যকণা দূর করা সহজ হয়।




