বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পুণ্যময় একটি তিথি হলো আষাঢ়ী পূর্ণিমা। এই পূর্ণিমা তিথি তথাগত বুদ্ধের জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। প্রথমটি হলো রাজকুমার সিদ্ধার্থের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, দ্বিতীয়টি গৃহত্যাগ বা মহাভিনিষ্ক্রমণ, তৃতীয়টি সারনাথে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের কাছে ধর্মচক্রপ্রবর্তন সূত্র দেশনা এবং চতুর্থটি শ্রাবস্তীতে যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শনের পর তাবতিংশ স্বর্গে গিয়ে মাতৃদেবীকে অভিধর্ম শিক্ষা দেওয়া। এই চারটি ঘটনাই আষাঢ়ী পূর্ণিমার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে কপিলাবস্তু নগরে এই তিথি সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো। সে সময় রাজা শুদ্ধোধনের মহিষী রানি মহামায়া আষাঢ়ী পূর্ণিমায় উপোস ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। সে রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন, চার দিকপাল দেবতা তাঁকে হিমালয়ের একটি সমতল ভূমিতে নিয়ে যান এবং একটি মহাশালবৃক্ষের নিচে রাখেন। পরে তাঁকে হিমালয়ের মানসসরোবরে স্নান করিয়ে দিব্য বসন ও মাল্যগন্ধে সাজানো হয়। এরপর একটি সুবর্ণ প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে দিব্যশয্যায় শয়ন করানো হলে একটি শ্বেতহস্তী উত্তর দিক থেকে এসে রজত পর্বতে আরোহণ করে এবং শ্বেতপদ্ম ধারণ করে মাতৃশয্যার দক্ষিণ পার্শ্ব ভেদ করে মাতৃজঠরে প্রবেশ করে। এই ঘটনাকে বৌদ্ধরা বোধিসত্ত্বের মাতৃকুক্ষিতে প্রতিসন্ধি গ্রহণ বলে বিশ্বাস করেন। পরদিন রানি স্বপ্নের বৃত্তান্ত রাজাকে জানালে রাজা ৬৪ জন জ্যোতিষী ডেকে পাঠান। তারা জানান, রানি পুত্র সন্তানের মা হবেন এবং সেই পুত্র দেবদুর্লভ গুণসম্পন্ন হবে। পরবর্তীতে সেই পুত্রই সিদ্ধার্থ নামে রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

সিদ্ধার্থের বয়স যখন ২৯ বছর, তখন তাঁর মনে বৈরাগ্যের ভাব প্রবল হয়। রাজা শুদ্ধোধন তাঁকে যশোধরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলেও সংসারের প্রতি তাঁর অনুরাগ জন্মায়নি। পরবর্তী আষাঢ়ী পূর্ণিমাতেই তিনি পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র, রাজ্য ও ভোগবিলাস সবকিছু ত্যাগ করে মহাভিনিষ্ক্রমণ বা গৃহত্যাগ করেন। এই ত্যাগ ছিল জগতের দুঃখ মোচনের জন্য। তারপর তিনি গয়ার বোধিদ্রুম মূলে ছয় বছর কঠোর সাধনার পর মহাবোধি বা চরম জ্ঞান লাভ করেন এবং সম্যক সম্বুদ্ধ হিসেবে আবির্ভূত হন।

বুদ্ধত্ব লাভের পর তিনি চিন্তা করলেন কাকে প্রথম তাঁর নবলব্ধ ধর্ম শিক্ষা দেবেন। প্রথমে ঋষি আড়ার কালাম ও রামপুত্র রুদ্রকের কথা মনে পড়লেও তারা ইতিমধ্যে পরলোকগমন করেছিলেন। তখন তিনি তাঁর পূর্বসঙ্গী পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের কথা স্মরণ করেন, যারা তাঁর কৃচ্ছ্রসাধনা ত্যাগের পর তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সেই আষাঢ়ী পূর্ণিমায় তিনি সারনাথের ঋষিপত্তন মৃগদাবে গিয়ে তাদের প্রথম ধর্মদেশনা ‘ধর্মচক্রপ্রবর্তন সূত্র’ প্রদান করেন। এই সূত্রে তিনি দুটি চরম পথ—গ্রাম্য কাম্যবস্তুর প্রতি অনুরক্তি ও আত্মক্লেশজনিত দুঃখাবরণ—ত্যাগ করে মধ্যমপথ অবলম্বনের কথা বলেন। তিনি চারটি আর্যসত্যের (দুঃখ, দুঃখোৎপত্তি, দুঃখনিরোধ ও নিরোধের মার্গ) শিক্ষা দেন।

বুদ্ধত্ব লাভের সপ্তম বছর পর আরেক আষাঢ়ী পূর্ণিমায় তিনি শ্রাবস্তীর নগরদ্বারে গণ্ডম্ব বৃক্ষমূলে যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন। এরপর তিনি তাবতিংশ দেবলোকে গিয়ে পারিজাত বৃক্ষমূলে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে উপবেশন করে অভিধর্ম দেশনা করেন। তাঁর মাতৃদেবীকে নির্বাণ লাভের হেতু উৎপন্ন করাই ছিল এই বর্ষাবাসের মূল উদ্দেশ্য।

প্রতি বছর আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন থেকেই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস শুরু হয়। এই তিথিতে বৌদ্ধরা সংযম, ধ্যান ও পুণ্যকর্মের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে এ তিথি উদযাপিত হয়ে আসছে। ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন, এই পূর্ণিমার তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, সবাই যেন আত্মসংযমের মাধ্যমে নির্বাণ লাভের হেতু উৎপন্ন করতে পারেন—এটাই কাম্য।